সামরিক বিশ্লেষকদের মত

যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই

যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। জয়ের দ্বারপ্রান্তে ইরান। এ যুদ্ধ থামানোর এখন একটাই উপায়। তা হলোÑ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা। যুদ্ধের মাঠে বা আলোচনার মাধ্যমে এ যুদ্ধ শেষ হবে না। কারণ ইরান ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় বসার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। আর ইরানও এ যুদ্ধ থামাবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন একটিমাত্র পথ খোলা। তথা একতরফা যুদ্ধবিরতি।
শুক্রবার রেডিও তেহরান বাংলার বিশ্ব সংবাদে এসব তুলে ধরা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলে ইরানও যুদ্ধ থামিয়ে দেবে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল এই যুদ্ধে পরাজয়ের পথে। কারণ তাদের পক্ষে ইরানে স্থল অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব নয়। আর কেবলমাত্র বিমান হামলা চালিয়ে কোনো দেশ জয় করা যায় না। সরকারও পরিবর্তন করা যায় না। রাশিয়া-ইউক্রেন চার বছরের যুদ্ধ তার প্রমাণ। ডনাল্ড ট্রাম্প তার একক সিদ্ধান্তে যুদ্ধ শুরু করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র আর্মিও এর বিরুদ্ধে। তাদের আর্মিকে বাধ্য করা হয়েছে সমস্ত নিয়মনীতি পেশাদারিত্বের বাইরে গিয়ে যুদ্ধে জড়াতে। ফলে তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারই বহিঃপ্রকাশ দেখা গেল বুধবার সিনেট আর্মড সার্ভিসেস সাব-কমিটির শুনানিতে। এ সময় ফোরস্টার একজন মেরিন জেনারেল বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ট্রাম্পের যুদ্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। ব্রায়ান ম্যাক গেইনিস নামের এই বিদ্রোহী জেনারেল বলেন, এ যুদ্ধ শুরু করা হচ্ছে ইসরাইলের জন্য। আমরা আমেরিকান ছেলেমেয়েরা ইসরাইলের জন্য যুদ্ধ করতে পারি না। তারা ইসরাইলের জন্য এভাবে জীবন দিতে পারে না। আমরা ইসরাইলের জন্য যুদ্ধ করবো না। আমেরিকা ইসরাইলের জন্য যুদ্ধ করবে না। এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তাকে থামানোর নির্দেশ দেন অন্যান্য কর্মকর্তারা। কিন্তু সেই জেনারেল না থেমে চিৎকার করে যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলতে থাকেন। তখন অন্যরা তাকে জোর জবরদস্তি করে টেনেহিঁচড়ে সেখান থেকে নিয়ে যান। এ সময় তার বাম হাত ভেঙে যায়।

যখন তাকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয় তখন তিনি ফিলিস্তিনের পক্ষে সেøাগান দেন। তিনি মেরিন সেনাদের বিদ্রোহের আহ্বান জানান যুদ্ধের বিরুদ্ধে। একজন ফোরস্টার জেনারেলকে এভাবে অপদস্ত করে সভা থেকে বের করার সময় সেখানে উপস্থিত অন্য সবাই নীরব বসে থাকেন। তখন একজন নারীকে বলতে শোনা যায়, আপনারা সবাই কি রোবট? তিনি একজন ফোরস্টার জেনারেল। তিনি একজন ফোরস্টার আমেরিকান জেনারেল।

প্রকাশিত বিভিন্ন খবরে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকান সেনাদের কোনো নৈতিক মনোবল নেই। তার প্রমাণ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আরব দেশের যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি ছেড়ে তারা পালিয়েছে। অনেকে আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন হোটেল এবং বেসামরিক এলাকায়। তাদের সব ঘাঁটি তছনছ হয়ে গেছে ইরানের মিসাইল হামলায়।

বিভিন্ন আরব দেশের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র আর্মিকে পুষছে। ইরানের হামলা থেকে রক্ষার নামে বিভিন্ন আরব দেশ মাল্টি ট্রিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেনে প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে। কিন্তু ইরানের হামলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এসব ঘাঁটি ওইসব আরব দেশগুলোকে রক্ষায় কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছে না।

সামরিক কর্মকর্তারা বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আর্মি যা করছে ইরানের বিরুদ্ধে তা সম্পূর্ণ তাদের নীতি ও পেশাদারিত্বের বিপরীত। তারা সবাই জানে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের এই হামলা সম্পূর্ণ অন্যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সমস্ত আইনের লঙ্ঘন। ফলে তারা হতাশ এ ধরনের যুদ্ধে। মঙ্গল ও বুধবার বাহরাইনে পঞ্চম নৌ বহর সদর দপ্তর লক্ষ্য করে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র দুই ঘণ্টা ছাড়া বাকি পুরো সময় জুড়ে টানা মিসাইল হামলা চলছে বাহরাইনে।

বুধবার ইসরাইলের রাজধানী তেল আবিব-জেরুজালেমসহ ব্যাপক ভিত্তিক মিসাইল হামলা চালিয়েছে ইরান। অপরদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফুজাইরা তেলের ডিপোতে একদিন হামলার পরও আগুন জ্বলছে। মঙ্গলবার ইরানের একটি মিসাইল আকাশে প্রতিহত করার পর অবশিষ্টাংশ পড়ে আগুন লাগে তেল ডিপোতে, বুধবার পর্যন্ত আগুন নেভাতে পারেনি তারা। বস্তুত ইরানের টানা মিসাইল হামলায় বেকায়দায় পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। দিশাহারা হয়ে গেছে দেশগুলোর সরকার। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না, সব যেন অকার্যকর হয়ে গেছে। দুবাইসহ বিলাসী বিভিন্ন শহর থেকে পালাচ্ছে সব বিদেশিরা। আরব শেখরা তীব্র আতঙ্কে আছেন। একইসঙ্গে তারা আতঙ্কে আছেন ইসরাইলও তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত করতে পারে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অংশ হিসেবে।

এদিকে প্রকাশিত এক জরিপে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ ভাগ মানুষ ইরানে আক্রমণের বিরুদ্ধে। অপরদিকে ইরানে যারা কিছুদিন আগেও সরকার পতনের জন্য রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে তারা এখন সরকারের পক্ষ। আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে। তারা সবাই এখন ঐক্যবদ্ধ। বিশেষ করে তাদের নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার পর তারা পণ করেছে- যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিহত করার। বিপরীতে ইরানে হামলার কারণে আমেরিকানদের জীবনও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। রকেট গতিতে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। অনেকদিন ধরেই বারবার মন্দার মুখোমুখি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি। কোনোমতে জোড়াতালি ও বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে বারবার ঠেকানো হচ্ছে দেউলিয়া পরিস্থিতি। এই অবস্থায় এই ধরনের ব্যয়বহুল যুদ্ধের বিরুদ্ধে তীব্রভাবে ফুঁসে উঠছে সব আমেরিকানরা। প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়েছে, ইরানের একটি ড্রোন ভূপাতিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আট থেকে ১২টি প্যাট্রিয়ট মিসাইল ছুড়ছে। যা অবিশ্বাস্য। কিন্তু এটাই বাস্তব। কারণ তারা পেশাদারিত্ব ও মনোবল হারিয়ে ফেলছে। যেখানে ইরানের একটি শাহেদ ১৩৬ মিসাইল দাম মাত্র ৪০-৫০ হাজার ডলার সেখানে একটি প্যাট্রিয়ট মিসাইলের দাম ৪০ লাখ ডলার। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায় ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ব্যয়ের পরিমাণ। ২৮শে ফেব্রুয়ারি হামলার পর থেকে বুধবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৩১-৩৪ বিলিয়ন ডলার।