যে কৌশলে ইরানে ‘ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি’ পাঠাচ্ছে চীন, টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে ইরানও। দেশটি ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে গোটা মধ্যপ্রাচ্য অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়েছে। এছাড়া বিশ্ব জালানি পরিহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এতে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
চীন এই যুদ্ধে ইরানকে গোপনে সহায়তা করছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন থেকে রাসায়নিক বহনকারী কয়েকটি জাহাজ ইরানে পৌঁছেছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই ঘটনাকে বিশ্লেষকেরা কেবল একটি সামরিক সরবরাহ হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত মার্কিন নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত চারটি ইরানি পতাকাবাহী জাহাজ দেশটির বন্দরে ভিড়েছে এবং আরও একটি জাহাজ উপকূলের কাছে অবস্থান করছে। চীনের ঝুহাই শহরের গাওলান বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করা এসব জাহাজ রাসায়নিক সংরক্ষণ সুবিধা ও বহনের জন্য পরিচিত।
এই জাহাজগুলোতে সোডিয়াম পারক্লোরেট বহন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা কঠিন জ্বালানিভিত্তিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিমাণ কাঁচামাল দিয়ে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি সম্ভব। ফলে এটি ইরানের চলমান সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কাজ করা মার্কিন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘাতের এই পর্যায়ে ইরান দ্রুত তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে এবং এই ধরনের আমদানি সেই চেষ্টারই প্রতিফলন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্র সিএনএন-কে জানিয়েছে, ইরানের প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এখনও অক্ষত রয়েছে, যা পূর্বের কিছু দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে কাঁচামাল আমদানি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দেশটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরোপুরি উৎপাদনক্ষমতা হারায়নি। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরান হয়তো বিকল্প বা ছড়িয়ে থাকা উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এসব জাহাজ রাষ্ট্রায়ত্ত ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান শিপিং লাইন গ্রুপ-এর আওতাভুক্ত এবং তারা নজরদারি এড়াতে নানা কৌশল ব্যবহার করেছে।
এর মধ্যে রয়েছে জাহাজের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস) বন্ধ রাখা, ভুয়া গন্তব্য দেখানো এবং নাম পরিবর্তন করা। বিশ্লেষকদের মতে, অনেক বেশি নিখুঁত হয়ে উঠা এই কৌশলগুলো আন্তর্জাতিক নজরদারিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
এই সরবরাহকে সময়ের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। কারণ, চলমান সংঘাতে ইরান ব্যাপক হারে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে এবং তাদের মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা হামলায় উৎপাদন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তাই এই ধরনের কাঁচামাল আমদানি ইরানকে অন্তত আরও কিছুদিন হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দেবে।
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘গোলবান’ ও ‘জাইরান’ নামের দুটি জাহাজের সক্ষমতা থেকে অনুমান করা যায় যে, ইরান অতিরিক্ত ৭৮৫টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট কাঁচামাল আমদানি করে থাকতে পারে।
এর অর্থ হলো, শুধু নতুন চালান দিয়েই যুদ্ধ পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের অনুমান অনুযায়ী ইরান আরও এক মাস ধরে সহজেই প্রতিদিন ১০ থেকে ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ অব্যাহত রাখতে পারে।
চীনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি সামরিক সহায়তার কথা অস্বীকার করলেও, বাণিজ্যিক পণ্যের আড়ালে এই ধরনের কাঁচামাল সরবরাহ অব্যাহত রাখছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। এতে একদিকে তারা আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে পারছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে। একই ধরনের কৌশল তারা রাশিয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে চীনের জন্য এটি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার বিষয়। এর কারণ ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা চালাচ্ছে, যেখানে বেইজিং অবকাঠামো প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ

