সিলেট বিভাগে ৬ স্বতন্ত্র প্রার্থীর উত্থান, চাপে বিএনপি–জামায়াত জোট

সিলেট বিভাগে ৬ স্বতন্ত্র প্রার্থীর উত্থান, চাপে বিএনপি–জামায়াত জোট

সিলেট বিভাগের একাধিক সংসদীয় আসনে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। বিভাগের অন্তত ছয়টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এখন মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসায় বিপাকে পড়েছে বড় দুই জোট। বিশেষ করে বিএনপি প্রার্থীরা পড়েছেন বাড়তি চাপে, কারণ শক্ত অবস্থানে থাকা স্বতন্ত্রদের বেশিরভাগই দলটির বিদ্রোহী নেতা।

স্থানীয় সূত্র ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতীত রাজনৈতিক অবস্থান, আঞ্চলিক প্রভাব, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং দলীয় কোন্দলের কারণে এসব স্বতন্ত্র প্রার্থী সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। ভোটারদের ধারণা, তাদের মধ্যে একাধিক প্রার্থীর জয়লাভের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত—উভয় জোটেই অস্বস্তি বিরাজ করছে।

সিলেট বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনে স্বতন্ত্রসহ বিভিন্ন দলের মোট ৯৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ১৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী, যাদের মধ্যে অন্তত ছয়জনকে শক্ত অবস্থানে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিলেট অঞ্চলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রভাব

সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন বিএনপির সাবেক নেতা মামুনুর রশিদ মামুন (চাকসু মামুন)। বরখাস্ত হওয়া জেলা বিএনপির এই সাবেক সিনিয়র সহসভাপতির পক্ষে বিএনপির একটি বড় অংশ ছাড়াও স্থানীয় জাপা ও আওয়ামী লীগের একাংশ সক্রিয় বলে জানা গেছে। তাঁর পক্ষে প্রচারে জড়িত থাকার অভিযোগে সম্প্রতি দুই উপজেলার ১২ জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি।

বহিষ্কৃত কানাইঘাট উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খছরুজ্জামান পারভেজ বলেন, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে মামুন মাঠে রাজনীতি করছেন, সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

মৌলভীবাজারে ত্রিমুখী ও চতুর্মুখী লড়াই

মৌলভীবাজার জেলার চারটি আসনে ২৪ জন প্রার্থীর মধ্যে সাতজন স্বতন্ত্র। মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ফজলুল হক খান সাহেদ—উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান—আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ও ফুলতলী পীরের অনুসারীদের সমর্থন পেয়েছেন। এই আসনে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের নিয়ে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনে একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির সাবেক পৌর মেয়র মহসিন মিয়া মধু। এখানে একাধিক দল ও জোটের প্রার্থী থাকায় ভোট ভাগাভাগির শঙ্কা রয়েছে।

হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে বিদ্রোহীদের দাপট

হবিগঞ্জ-১ (বাহুবল-নবীগঞ্জ) আসনে বিএনপির সাবেক এমপি শেখ সুজাত মিয়া স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি দলীয় প্রার্থী রেজা কিবরিয়ার বিরুদ্ধে দলীয় ও ব্যক্তিগত নানা বিতর্ককে কাজে লাগাতে চাইছেন তিনি। ফলে এখানে মূল লড়াই রেজা–সুজাত দ্বৈরথেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সুনামগঞ্জে পাঁচটি আসনের মধ্যে সুনামগঞ্জ-৩ ও সুনামগঞ্জ-৪ আসনে স্বতন্ত্র ও দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে। সুনামগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ার হোসেনের পক্ষে দলীয় একাংশ সক্রিয় থাকায় দলীয় প্রার্থী কয়ছর আহমেদের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। সুনামগঞ্জ-৪ আসনে সাবেক মেয়র দেওয়ান জয়নুল জাকেরীনের জয়ের সম্ভাবনাও শক্ত বলে মত দিয়েছেন কয়েকজন দলীয় কর্মী।

জোট নেতাদের অবস্থান

বিএনপির বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, “দলীয় নেতাকর্মীরা জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। যারা স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

অন্যদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, জোটের শরিক দলগুলো যেসব আসনে প্রার্থী দিয়েছে, সেসব আসনেও জামায়াতের নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছেন। প্রতিপক্ষ কোনো প্রার্থীকে নিয়ে তারা শঙ্কিত নন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সিলেট বিভাগের বিভিন্ন আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ঘিরে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।