সিলেট থেকে বন্ধ হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক কার্গো ফ্লাইট
সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশার পর চালু হওয়া সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক কার্গো ফ্লাইট কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। উদ্বোধনের এক বছরের মধ্যেই থমকে গেছে এই কার্যক্রম।
গত বছরের ২৫ এপ্রিল প্রথমবারের মতো সিলেট থেকে আন্তর্জাতিক কার্গো ফ্লাইটের উদ্বোধন করা হয়। তবে সর্বশেষ গত বছরের ১ নভেম্বরের পর থেকে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আর কোনো কার্গো বিমান উড্ডয়ন করেনি। ফলে প্রায় পাঁচ মাস ধরে সিলেট থেকে আন্তর্জাতিক কার্গো ফ্লাইট চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আপাতত কার্গো ফ্লাইট স্থগিত রয়েছে। তবে বিদেশি আমদানিকারকদের আগ্রহ থাকলে পুনরায় প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ফ্লাইট চালু করা সম্ভব।
সিলেটের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই সরাসরি কার্গো ফ্লাইট চালুর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বিশেষ করে সিলেটে উৎপাদিত সবজি, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বিদেশে ব্যাপক চাহিদা থাকায় তারা এই উদ্যোগকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় মনে করেছিলেন।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল গ্যালিস্টেয়ার এভিয়েশনের ব্যবস্থাপনায় একটি কার্গো বিমান ৬০ টন তৈরি পোশাক নিয়ে স্পেনের উদ্দেশে যাত্রা করে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ওই ফ্লাইটকে ওয়াটার ক্যানন স্যালুট দিয়ে বিদায় জানায়।
এরপর সাত মাসে সিলেট থেকে ইউরোপের দেশ স্পেনে মোট ৪১টি কার্গো ফ্লাইট পরিচালিত হয়। এসব ফ্লাইটে প্রায় ২ হাজার ৩৫০ টন তৈরি পোশাক রপ্তানি করা হয়। তবে হঠাৎ করেই গত নভেম্বর থেকে সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্য পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধা না থাকায় কৃষিপণ্য ও সবজি রপ্তানি সম্ভব হয়নি। কার্গোর পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরীক্ষার জন্য একটি আধুনিক ল্যাব স্থাপনের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরীক্ষামূলক যাচাই ছাড়া পণ্য পাঠানো সম্ভব না হওয়ায় পুরো উদ্যোগটি মুখ থুবড়ে পড়ে।
তাছাড়া কার্গো ফ্লাইটগুলো শুধুমাত্র তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এক পণ্যের ওপর নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবকেই এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, কার্গো ফ্লাইট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক কার্গো টার্মিনালটি অচল হয়ে পড়বে। প্যাকেজিং সুবিধা ও ল্যাব টেস্টিং ব্যবস্থা না থাকায় কার্গো কার্যক্রম টেকসই হয়নি। এতে কৃষিপণ্য, সবজি ও ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে পরিবহন ব্যয়, সময় ও ঝুঁকি।
যুক্তরাজ্যের এক্সপ্রেস কার্গোর স্বত্বাধিকারী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এনামুল করিম বলেন, বিমানবন্দরে যদি প্যাকেজিং সিস্টেম ও মান যাচাইয়ের ল্যাব স্থাপন না করা হয়, তাহলে সিলেট থেকে কার্গো রপ্তানি কখনোই টেকসই হবে না। এ কারণেই ব্যবসায়ীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন।
সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ বলেন, প্রয়োজনীয় প্যাকেজিং ব্যবস্থা ও পরীক্ষাগার না থাকায় ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। পরীক্ষামূলক যাচাই ছাড়া পণ্য পাঠানো সম্ভব না হওয়ায় পুরো উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেবিচকের এক কর্মকর্তা জানান, সিলেট থেকে রপ্তানিকৃত সব পণ্যই ছিল তৈরি পোশাক, যা মূলত চার্টার্ড বিমানে পাঠানো হতো। শীত মৌসুমে গ্রীষ্মকালীন পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ায় বর্তমানে ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে না।
এ বিষয়ে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক মো. হাফিজ আহমেদ বলেন, কার্গো ফ্লাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে। তারা স্থগিতাদেশ তুলে নিলে আবার ফ্লাইট চলবে। পণ্য প্যাকেজিং হাউজ নির্মাণ আমাদের এখতিয়ারভুক্ত নয়। এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ প্রয়োজন।

