সিলেটে ভোট বাড়লেও পরাজয়ের বৃত্তে বন্দি জামায়াত

সিলেটে ভোট বাড়লেও পরাজয়ের বৃত্তে বন্দি জামায়াত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোটবদ্ধ হয়ে একাধিকবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তবুও অতীত ইতিহাসে বড় ধরনের সাফল্য পায়নি দলটি।

বিএনপি জোটের সাথে ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো সংসদে যাওয়ার সুযোগ পায় জামায়াত। ওই সময় ১৭ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয় সারা দেশে।

সে সময় সিলেট ১৯টি আসনের মধ্যে কেবল ১টি আসন লাভ করেছিল জামায়াত। এটাই বিগত ৩৫ বছরে ভোটের লড়াইয়ে একমাত্র সাফল্য। এছাড়া আর কোনো নির্বাচনে জামায়াত সংসদ সদস্য পায়নি। 
১৯৯১ সাল থেকে নির্বাচনে সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও দীর্ঘ ৩৫ বছরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারই প্রথম এককভাবে ২শ’র অধিক আসনে প্রার্থী দেয় জামায়াত।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের নেতৃত্বে থেকে ২২৯টি আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নিজস্ব প্রার্থী দেয় দলটি। ২৯৭টি আসনের ফলাফলে জামায়াত এককভাবে দাঁড়িপাল্লার প্রতীকে ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে, যা তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন।
 
কিন্তু এবাবের নির্বাচনে সারা দেশে চমকপ্রদ সাফল্যে পেলেও সিলেটে পরাজয়ের বৃত্তে থাকতে হলো ১৯৭১ সালের পটভূমির ঘটনায় সমালোচিত ইসলামী এই দলটিকে।
 
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সিলেটে মোট ভোটের হার আগের নির্বাচনের তুলনায় বেড়েছে।


কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। যদিও প্রায় অর্ধেকের বেশি ভোটার ভোট দিতে আসেননি। তারপরও এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হলেও ফলাফলে বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
ভোট বাড়লেও জামায়াতের পক্ষে সেটি কাজে আসেনি। যেসব এলাকায় দলটির ঐতিহ্যগত সমর্থন ছিল, সেখানেও প্রত্যাশিত ভোট ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।

অনেক কেন্দ্রে তাদের প্রার্থী তৃতীয় বা চতুর্থ অবস্থানে নেমে গেছে। ভোটারদের বড় অংশ কৌশলগত ভোট দিয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো সংগঠন ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতিতে এগিয়ে ছিল। নির্বাচনী প্রচারণা, ভোটার যোগাযোগ এবং শেষ মুহূর্তের উপস্থিতি জামায়াতের তুলনায় ছিল বেশি কার্যকর। ফলে সামগ্রিকভাবে ভোট বাড়ার সুবিধা তারা নিতে পারেনি।

মূলত সিলেটের মানুষ ধর্মপ্রাণ হলেও ইসলামী দলগুলো জোটে বিভক্ত হওয়ায় ভোটের মাঠে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, বিএনপি জোট থেকে ইসলামী ঐক্যজোট, ফুলতলী মসলকের সংগঠন আল ইসলাহ, হেফাজতে ইসলামের নীরবতা ও জামায়াত বিরোধী মনোভাব, কওমী বিরোধ জামায়াতের জয়ের পথরুদ্ধ করেছে।

সেই সঙ্গে সুপ্ত থাকা আওয়ামী ভোট ও সংখ্যালঘু ধর্মীয় ভোট, চা শ্রমিকদের ভোট জামায়াতের পরাজয়ের আরেকটি অন্যতম কারণ। 

এছাড়া জয়ের সম্ভাব্য আসনে জামায়াত নেতাদের বাদ দিয়ে জোট থেকে প্রার্থী নির্ধারণে অভ্যন্তরীণ বিরোধ কাজ করেছে ভোটের মাঠে।  সবচেয়ে বড় কারণ, নির্বাচনে দীর্ঘদিন জামায়াতের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও সাধারণ ভোটারের সাথে দূরত্ব কাটিয়ে উঠতে না পারাটা নির্বাচনে বিজয়ের পথে বড় অন্তরায় হিসেবে দেখছেন বিশিষ্টজনরা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সিলেটে ভোটের হার বৃদ্ধি রাজনৈতিকভাবে ইতিবাচক ইঙ্গিত হলেও জামায়াতের জন্য এবারের নির্বাচন হয়েছে হতাশাজনক। ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে সংগঠন পুনর্গঠন ও ভোটার আস্থার জায়গায় বড় পরিবর্তন আনতেই হবে। যদিও সিলেট বিভাগে জামায়াতের প্রার্থীরা অতীতের তুলনায় ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তারপরও  কাঙ্খিত ফলাফল যেন অধরাই থেকে গেলো। ভোটে উত্থানকেই জামায়াতের বড় ‘বিজয়’ হিসেবে দেখা হলেও সিলেটে থেকে এবারও জাতীয় সংসদে থাকছে না দাঁড়িপাল্লার কোনো প্রতিনিধি।
 
এবার সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের ১১টি আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভোট পেয়েছেন সর্বমোট ৮ লাখ ৯০ হাজার ৪৯টি এবং তাদের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করে অন্যান্য প্রার্থীরা পেয়েছেন ৪ লাখ ৬ হাজারের বেশি। ১৯টি আসনে জোটগত জামায়াত ভোট পেয়েছেন ১২ লাখ ৯৬ হাজারের বেশি অর্থাৎ প্রায় ১৩ লাখ।
 
অপরদিকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিএনপি জোট পেয়েছে সাড়ে ২৪ লাখ ভোট। ১৯টি আসনের ১৮টিতেই পরাজিত জামায়াত। কেবল সিলেট-৫ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী জয় নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে জামায়াতকে।
 
সিলেটের ৬টি আসনের ৩টিতে সরাসরি জামায়াতের প্রার্থী এবং ৩টি শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। তাতে জোটের ভোট বাড়লেও ফলাফলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি।
 
এছাড়া দীর্ঘ ১৭ বছর বিএনপির নেতাকর্মীরা আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। মানুষের ভোটের অধিকার আদায়ে জুলুম নির্যাতন, কারাবরণ, ইলিয়াস আলীসহ নেতাকর্মী গুম-খুনের ঘটনায় বিএনপির প্রতি জনমনে ব্যাপক সহানুভূতি তৈরি হয়েছে। তারেক রহমানের নির্বাসন ও সদ্য প্রয়াত দলীয় চেয়ারপার্সনের মৃত্যু মানুষকে ব্যথিত করেছে। যিনি বিগত দিনে সরকারযন্ত্রের নির্যাতনের শিকার হয়েও দেশত্যাগ করেননি। খালেদা জিয়ার অশ্রুসিক্ত একটি কথা জনতার মনে আজো চির ভাস্মর, ‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এই দেশই আমার ঠিকানা’— এই উক্তিটি কেবল সাধারণ জনগণ নয়, বিরোধী মতের লোকজনের মনেও ধাক্কা লাগে। 
 
এছাড়া একাত্তর প্রশ্নে জামায়াতের অমীমাংসিত ভূমিকা ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপিতেই আস্থা খুঁজে নেয় ভোটাররা।
 
সিলেট-১: আসনটিতে ধানের শীষ প্রতীকে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯৩৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। পক্ষান্তরে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে মাওলানা হাবিবুর রহমান ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯৮৩ ভোট পেয়েছেন। ১১ দলীয় জোট মনোনীত জামায়াত প্রার্থী লক্ষাধিক ভোট পেয়েও পরাজয়ে বিএনপির ঐক্যবদ্ধ শক্তি জয়ের মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
 
অন্যদিকে, জোট করার কারণে জামায়াত ভোট বেশি পেয়েছে। কেননা, এককভাবে জামায়াতের তেমন ভোট নেই। তবে এবার ‘ডোর টু ডোর’ প্রচারণার কারণে নারী ভোটে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে দলটি। এই জায়গাটিতে বিএনপি প্রচারণায় পিছিয়ে ছিল।
 
অপরদিকে, সিলেট-৪ আসনে সীমান্তবর্তী অঞ্চল কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী লক্ষাধিক ভোটে জয় পেয়েছেন। তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী জামায়াতের প্রার্থী জয়নাল আবেদীন। তিনি জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের দুই বারের সাবেক চেয়ারম্যানও ছিলেন। কিন্তু তার প্রতিপক্ষ ধানের শীষের প্রার্থী সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়রের গুরুত্বপূর্ণ পদে টানা দশ বছর প্রতিনিধিত্ব করেছেন। নগর এলাকায় তার হাত ধরে হওয়া ব্যাপক উন্নয়ন জনতার মুখে মুখে ছিল। ২০০১ সালে বিএনপি থেকে নির্বাচিত অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের আস্থাভাজন হিসেবে আরিফের হাত ধরেই অত্র এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়, যা ভোটের ফলাফল নির্ধারণে টনিক হিসেবে কাজ করেছে। তার পক্ষে স্থানীয় বিএনপিকেও ঐক্যদ্ধ করতে সক্ষম হওয়ায় ভূমিধ্বস বিজয় লাভ করেন। তাছাড়া জমিয়তের পুরো শক্তিও আরিফকে সাপোর্ট করেছে অবলীলায়।
 
সিলেট-৬: আসনটিতে জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট এমরান আহমদের সাথে ভোটে লড়ে সামান্য ভোটে হেরে যান। অবশ্য তিনিও লক্ষাধিক ভোট পেয়েছেন। তাকে সর্বশক্তি দিয়ে বিজয়ী করতে চেষ্টা করেছে জামায়াত। তবে ধানের শীষের প্রতীকে স্থানীয় আল ইসলাহ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট এমরানের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছে। এছাড়া একই আসনে জমিয়তের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী ফখরুল ইসলাম ভোটে অংশ নিলে স্থানীয়ভাবে জামায়াতের ভোটে ভাগ বসান। স্বতন্ত্র এই প্রার্থী ২৩ হাজার ভোট পেয়েছেন। বিজয়ী প্রার্থীর সাথে পরাজিত জামায়াত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ১৩ হাজার।
 
সিলেট-২, ৩ ও ৬ আসন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের ছেড়ে দেয় জামায়াত। সিলেট-২ আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী ইলিয়াস পত্নী  তাহসিনা রুশদির। মূলত নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর প্রতি মানুষের আবেগ লুনার ভোটের ব্যবধান বাড়িয়েছে। সেই সঙ্গে তাকে নিয়ে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ ছিল। অপরদিকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মুনতাসির আলীর এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা না থাকাটা বড় কারণ।
 
সিলেট-৩: আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ মালিক। তার বিপরীতে লোকমান আহমদকে প্রার্থী করে জামায়াত। পরে আসন ভাগাভাগিতে জোটকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাতেই ভাগ্য যেনো সুপ্রসন্ন হতে থাকে মালেকের। ভোটে শুরুর দিকে বিরোধ থাকলেও বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় বিজয় নিশ্চত হয় মালেকের। অন্যদিকে রিকশা প্রতীকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীকে গুরুত্ব সহকারে নেয়নি জামায়াত। এটার খেসারত দিতে হয়েছে পরাজয়ে।
 
অবশ্য সিলেট-৫ আসনে ১১ দলীয় জোট থেকে খেলাফত মজলিসের প্রাথী মুফতি আবুল হাসান বিএনপি জোটের প্রার্থী জমিয়তের উবায়দুল্লাহ ফারুক ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রাথীর মামুনুর রশিদ। এই আসনে আল ইসলাহ ভোটে ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। যে কারণে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। পক্ষন্তিরে ধরাশায়ী হয়েছেন বিএনপি জোটের প্রার্থী।