এআইয়ের দখলে পৃথিবী, ইলন মাস্কের ১০ ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী

এআইয়ের দখলে পৃথিবী, ইলন মাস্কের ১০ ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী

এআই পুরো পৃথিবীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিচ্ছে। মানুষের প্রায় সব ডিজিটাল কাজ করে দিচ্ছে এআই, কোডিংয়ে মানুষ আর যন্ত্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না, বিশ্বের সেরা সার্জনকেও ছাড়িয়ে যাবে হিউম্যানয়েড রোবট। এরপর মানুষের সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কাজ হয়ে যাবে ঐচ্ছিক, আসতে পারে ‘ইউনিভার্সাল হাই ইনকাম’। এমনকি একসময় টাকার গুরুত্বও নাকি হারিয়ে যেতে পারে। শুনতে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো হলেও গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও অনুষ্ঠানে এমন ভবিষ্যতের কথাই বলেছেন ইলন মাস্ক।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাস্কের নামে ২০২৭ থেকে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত একটি বছরভিত্তিক ভবিষ্যদ্বাণীর তালিকা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিনি কোনো

একটি সাক্ষাৎকারে বসে ১০ বছরের এমন ধারাবাহিক তালিকা দেননি। বরং ভিভোটেক, পিটার ডায়ামান্ডিসের মুনশটস, ফর্বোস, দ্য ইকোনোমিস্ট এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি সম্মেলনে দেওয়া তার বক্তব্যগুলো একসঙ্গে রাখলে এই ভবিষ্যৎ-চিত্রের বড় অংশের উৎস পাওয়া যায়। কোথাও মাস্ক নির্দিষ্ট সাল বলেছেন, আবার কোথাও তার বলা ‘তিন বছর’, ‘পাঁচ বছর’ কিংবা ‘১০ বছর’ ধরে পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট সাল হিসাব করা হয়েছে।

২০২৭: ডিজিটাল কাজে এআইয়ের আধিপত্য
মাস্কের ধারণা, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কম্পিউটার বা স্মার্টফোনে করা প্রায় সব ধরনের কাজ মানুষের সমপর্যায়ে বা তার চেয়েও ভালোভাবে করতে পারবে এআই। সফটওয়্যার তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ, ডিজাইন, লেখালেখি কিংবা বিভিন্ন জ্ঞাননির্ভর কাজ, সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়বে।

২০২৬ সালের বক্তব্যে তিনি এমন সম্ভাবনাও তুলে ধরেছেন যে, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ যেসব কাজ করতে সরাসরি বাস্তব জগতের কোনো বস্তু নাড়াচাড়া করতে হয় না, সেগুলোর বড় অংশ এআইয়ের সক্ষমতার মধ্যে চলে আসতে পারে।

তবে এর অর্থ ২০২৭ সালেই সব অফিসকর্মীর চাকরি শেষ হয়ে যাবে, এমন নয়। প্রযুক্তি কোনো কাজ করতে সক্ষম হওয়া আর প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি মানুষ বাদ দিয়ে সেই প্রযুক্তি গ্রহণ করা এক বিষয় নয়। বাস্তবে অনেক পেশাতেই মানুষের কাজ বিলুপ্ত হওয়ার বদলে কাজের ধরন বদলাতে পারে।

২০২৮: কোডিংয়ে মানুষের ‘চেকমেট’?
সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট নিয়ে মাস্কের পূর্বাভাস আরও নাটকীয়। তার মতে, কোড লেখার ক্ষেত্রে এআই খুব দ্রুত এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে নিছক গতি ও দক্ষতায় মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতাই অর্থহীন হয়ে যেতে পারে।
তিনি এর সঙ্গে দাবার শক্তিশালী ইঞ্জিন স্টকফিসের তুলনা করেছেন। আজ বিশ্বের সেরা দাবাড়ুর পক্ষেও স্টকফিসের সঙ্গে সমানভাবে লড়াই করা প্রায় অসম্ভব। মাস্কের ধারণা, সফটওয়্যার তৈরির ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

২০২৬ সাল থেকে তার দেওয়া ১২ থেকে ১৮ মাসের সময়সীমা ধরলে সেটি ২০২৭ সালের শেষ কিংবা ২০২৮ সালের দিকে পড়ে। তখন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের কাজ হয়তো কোডের প্রতিটি লাইন নিজে লেখা নয়; বরং সমস্যা নির্ধারণ, এআইকে সঠিক নির্দেশ দেওয়া এবং তৈরি করা সফটওয়্যার যাচাইয়ের দিকে চলে যেতে পারে।

২০২৯: অপারেশন করবে অপটিমাস?
চিকিৎসা নিয়ে মাস্কের অন্যতম সাহসী পূর্বাভাস টেসলার হিউম্যানয়েড রোবট অপটিমাস ঘিরে। মুনশটসে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এই ধরনের রোবট কবে বিশ্বের সেরা মানব সার্জনের চেয়েও ভালো অস্ত্রোপচার করতে পারবে?
মাস্কের উত্তর ছিল, প্রায় তিন বছরের মধ্যে। ২০২৬ থেকে হিসাব করলে সময়টি দাঁড়ায় ২০২৯।

তার যুক্তি, মানুষের হাতের সূক্ষ্মতার সীমা রয়েছে, ক্লান্তি আসে এবং একজন সার্জন জীবনে সীমিতসংখ্যক অপারেশনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। কিন্তু ভবিষ্যতের রোবট একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অসংখ্য অস্ত্রোপচার থেকে শেখা অভিজ্ঞতা একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারবে। রোবোটিক সার্জারি অবশ্য এরই মধ্যে বাস্তব। কিন্তু সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় হিউম্যানয়েড রোবট বিশ্বের সেরা চিকিৎসকদের ছাড়িয়ে যাবে,এটি এখনো মাস্কের পূর্বাভাস, প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা নয়।

২০৩০-৩১: মানুষকেই ছাড়িয়ে যাবে এআই?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে মাস্কের সবচেয়ে আলোচিত বক্তব্য সম্ভবত এটিই। তার ধারণা, ২০৩০ বা ২০৩১ সালের আশপাশে ডিজিটাল ইন্টেলিজেন্স শুধু একজন মানুষকে নয়, পৃথিবীর সব মানুষের সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এ ধরনের অবস্থাকে সাধারণভাবে ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ বলা হয়। অর্থাৎ বিজ্ঞান, গণিত, প্রযুক্তি, পরিকল্পনা কিংবা সমস্যা সমাধানের মতো ক্ষেত্রে মানুষের সম্মিলিত সক্ষমতার চেয়েও শক্তিশালী কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। তবে কবে এমন প্রযুক্তি আসবে, তা নিয়ে এআই গবেষকদের মধ্যে বড় মতপার্থক্য রয়েছে। মাস্কের সময়সীমা প্রযুক্তি দুনিয়ার তুলনামূলকভাবে আগ্রাসী পূর্বাভাসগুলোর একটি।

২০৩১: ১০ কোটি থেকে ১০০ কোটি হিউম্যানয়েড রোবট?
ফোর্বসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাস্ক আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্বে অন্তত ১০ কোটি হিউম্যানয়েড রোবট থাকতে পারে। এমনকি সংখ্যাটি ১০০ কোটিতেও পৌঁছাতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
এই জায়গায় প্রচলিত বাজার বিশ্লেষণের সঙ্গে তার পূর্বাভাসের বড় পার্থক্য রয়েছে। মর্গান স্ট্যানলি-এর মতো প্রতিষ্ঠান এক বিলিয়ন হিউম্যানয়েড রোবটের পর্যায়টি ২০৫০ সালের কাছাকাছি দেখেছে। অর্থাৎ অন্যরা যেখানে দুই দশকের বেশি সময় দেখছেন, মাস্ক সেখানে কয়েক বছরের মধ্যে বিস্ফোরক প্রবৃদ্ধির কথা বলছেন।

২০৩২: অর্থনীতি দ্বিগুণ করে দেবে এআই-রোবট?
মাস্কের মতে, এআই এবং রোবটিকস শুধু মানুষের চাকরির ধরনই বদলাবে না, বিশ্ব অর্থনীতির আকারও বদলে দিতে পারে। ফোর্বসের সাক্ষাৎকারে তিনি পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেন। ২০২৬ থেকে হিসাব করলে সময়টি মোটামুটি ২০৩১ থেকে ২০৩৩ সালের মধ্যে পড়ে। ফলে ২০৩২-কে মাঝামাঝি একটি বছর হিসেবে ধরা হয়েছে।

এর পেছনে তার যুক্তি উৎপাদনক্ষমতা। একজন মানুষ দিনে নির্দিষ্ট সময় কাজ করতে পারেন। কিন্তু রোবট প্রায় সারাক্ষণ কাজ করতে পারলে এবং একই এআই থেকে একসঙ্গে শিখতে পারলে পণ্য ও সেবা উৎপাদন নাটকীয় হারে বাড়তে পারে।

২০৩৩-৩৪: পেনশন, সঞ্চয় আর ‘ইউনিভার্সাল হাই ইনকাম’
ভাইরাল তালিকায় বলা হচ্ছে, ২০৩৩ সালে দীর্ঘমেয়াদি পেনশন সঞ্চয়ের প্রচলিত ধারণা অর্থ হারাবে এবং ২০৩৪ সালে চালু হবে ‘ইউনিভার্সাল হাই ইনকাম’। এখানে কিছুটা সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। মাস্ক সত্যিই বলেছেন, এআই ও রোবটের কারণে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি এতটাই বদলে যেতে পারে যে ১০ বা ২০ বছর পরের অবসরের জন্য আজকের মতো করে অর্থ জমিয়ে রাখার ধারণাই একসময় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়তে পারে। তবে তিনি সরাসরি ২০৩৩ সাল নির্ধারণ করেননি।

একইভাবে ‘ইউনিভার্সাল হাই ইনকাম’ ধারণাটিও তার বক্তব্যে আছে। ২০২৪ সালের ভিভোটেকে মাস্ক বলেন, ইতিবাচক এআই ভবিষ্যতে মানুষের চাকরি করার প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। তখন ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম নয়, বরং ইউনিভার্সাল হাই ইনকাম থাকতে পারে,মানুষ প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা সহজেই পাবে। তবে ২০৩৪ সালে এটি নিশ্চিতভাবে চালু হবে, এমন নির্দিষ্ট ঘোষণা তিনি দেননি।

২০৩৫: কাজ হবে শখের মতো
মাস্ক যে ভবিষ্যতের কথা সবচেয়ে বেশি বলেছেন, তার একটি হলো, একসময় কাজ করা মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক থাকবে না। বিষয়টি বোঝাতে তিনি বাগান করার উদাহরণ দিয়েছেন। বাজার থেকে খুব সহজেই সবজি কেনা যায়। তারপরও অনেকে আনন্দের জন্য নিজের বাগানে সবজি ফলান। ভবিষ্যতে চাকরিও তেমন হতে পারে, বেঁচে থাকার জন্য নয়, ভালো লাগা থেকে মানুষ কাজ করবে। তিনি বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য ১০ থেকে ২০ বছরের সময়সীমার কথা বলেছেন। সেই রেঞ্জের প্রথম দিকটি ধরলে ২০৩৫ সালের আশপাশে এমন পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

২০৩৬: এক বিলিয়ন রোবট, টাকাও কি অপ্রয়োজনীয়?
মাস্কের সবচেয়ে চমকপ্রদ পূর্বাভাসগুলোর একটি ২০৩৬ সালকে ঘিরে। তার ধারণা, আগামী এক দশকের মধ্যে বিশ্বে ১০০ কোটির বেশি হিউম্যানয়েড রোবট থাকতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, যদি এআই ও রোবট এত বিপুল পরিমাণ পণ্য ও সেবা উৎপাদন করতে পারে যে মানুষের প্রায় সব প্রয়োজন সহজেই পূরণ হয়ে যায়, তাহলে একসময় টাকার গুরুত্বও অনেক কমে যেতে পারে।


যুক্তিটি সহজ। টাকা মূলত সীমিত পণ্য ও সেবা বিনিময়ের মাধ্যম। যদি উৎপাদন এত বেড়ে যায় যে প্রয়োজনীয় জিনিসের সংকটই না থাকে, তাহলে অর্থের বর্তমান ভূমিকা বদলে যেতে পারে। তবে এখানেও বাস্তবতা ও মাস্কের পূর্বাভাসের মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। হিউম্যানয়েড রোবট শিল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। প্রযুক্তির দাম, নিরাপত্তা, আইন, উৎপাদনক্ষমতা এবং মানুষের গ্রহণযোগ্যতা,সবকিছুই এই গতিকে প্রভাবিত করবে।

ভবিষ্যৎ কি সত্যিই এত দ্রুত আসবে?
ইলন মাস্কের সব ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক সময়মতো সত্যি হবে,এমন নিশ্চয়তা নেই। অতীতেও তিনি অনেক প্রযুক্তির সময়সীমা নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী ছিলেন। তবু তার বক্তব্যগুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করাও কঠিন। কারণ এআই এরই মধ্যেই লেখালেখি, কোডিং, গবেষণা, ডিজাইন ও চিকিৎসার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঢুকে পড়েছে। অন্যদিকে টেসলা, বোস্টন ডায়নামিক্স-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হিউম্যানয়েড রোবটকে পরীক্ষাগার থেকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে আনার চেষ্টা করছে।
তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো ২০৩০ না ২০৩১, কিংবা ২০৩৫ না ২০৩৬, সেটি নয়। আসল প্রশ্ন হলো, পরিবর্তনটি কত দ্রুত ঘটবে এবং মানুষ তার জন্য কতটা প্রস্তুত।

মাস্কের ভবিষ্যৎ সত্যি হলে আগামী এক দশকে মানুষ এমন এক পৃথিবীতে প্রবেশ করতে পারে, যেখানে বুদ্ধিমত্তা, শ্রম ও উৎপাদনের প্রধান উৎস আর মানুষ থাকবে না। আর তখন সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি প্রযুক্তিকে নিয়ে হবে না, মানুষকে নিয়েই হবে,যদি জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করতে না হয়, আর প্রায় সব প্রয়োজনই যন্ত্র পূরণ করে দেয়, তাহলে মানুষ তার সময়, পরিচয় এবং জীবনের অর্থ খুঁজবে কোথায়?