পদ-পদবির প্রতিযোগিতা, নাকি সিলেটের উন্নয়ন? বিএনপি নেতাদের আত্মজিজ্ঞাসার সময় এখনই

পদ-পদবির প্রতিযোগিতা, নাকি সিলেটের উন্নয়ন? বিএনপি নেতাদের আত্মজিজ্ঞাসার সময় এখনই
ফটো : তারেক আহমাদ খান

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা তৎপরতা, গণসংযোগ ও সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়ার প্রতিযোগিতা। দলের ভেতরে ও বাইরে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে অনেকেই নানাভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতা যখন জনসেবার চেয়ে পদ-পদবি অর্জনের লড়াইয়ে বেশি পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য কি জনকল্যাণ, নাকি ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি অর্জন?

সিলেটের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘিরে আমার মনেও এমন কিছু প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খায়। যারা ইতোমধ্যে দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি কিংবা বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের অনেকেই আবার নতুন নতুন পদ ও দায়িত্বের প্রত্যাশায় মাঠে সক্রিয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, একজন মানুষের আর কত পদ-পদবি প্রয়োজন? কত সম্পদ, কত সম্মান আর কত ক্ষমতা অর্জন করলে একজন রাজনৈতিক নেতা সন্তুষ্ট হবেন?

রাজনীতিতে সম্মান অর্জন করা দোষের কিছু নয়। বরং জনগণের ভালোবাসা ও আস্থা অর্জনই একজন নেতার সবচেয়ে বড় সাফল্য হওয়া উচিত। কিন্তু যখন পদ-পদবিই রাজনৈতিক সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তখন জনসেবার আদর্শটি কোথায় গিয়ে ঠেকে?

একাধিক পদে একই ব্যক্তির আধিপত্য, সুযোগ কোথায় অন্যদের?

একটি রাজনৈতিক দল তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার ভিত্তিতে নতুন নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সুযোগ থাকে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্ব যদি বারবার একই ব্যক্তিদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে নতুন ও যোগ্য নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ছবিতে যেসব নেতাকে দেখা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে যাঁরা ইতোমধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁদের কাছে একটি বিনীত প্রশ্ন—আর কত পদ-পদবি প্রয়োজন? একটি পদে থেকে যদি একজন নেতা মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারেন, তাহলে একাধিক পদ আঁকড়ে রাখার প্রয়োজনীয়তা কোথায়?

অবশ্যই, একাধিক দায়িত্বে থাকা মানেই কেউ জনস্বার্থবিরোধী কাজ করছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তবে রাজনৈতিক সংগঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বের ভারসাম্য, জবাবদিহি এবং নতুন নেতৃত্বের জন্য সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

যদি একই ব্যক্তিরা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের সুযোগ নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন, তাহলে অন্য যোগ্য ব্যক্তিরা কীভাবে সামনে আসবেন? সমাজে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাঁদের সততা, দক্ষতা ও কাজ করার আগ্রহ আছে; কিন্তু নেতৃত্বের সুযোগ না পাওয়ায় তাঁরা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন না।

রাজনীতি কি ব্যক্তিগত অর্জনের মাধ্যম, নাকি মানুষের সেবা করার অঙ্গীকার?

একজন রাজনৈতিক নেতার প্রকৃত পরিচয় তাঁর পদ-পদবিতে নয়; বরং মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো, নাগরিক অধিকার রক্ষা করা এবং সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখার মধ্যে।

রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতা, পরিচিতি, ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি কিংবা সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যম হয়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে কীভাবে? অন্যদিকে, রাজনীতির উদ্দেশ্য যদি হয় মানুষের জীবনমান উন্নত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা, তাহলে পদ-পদবি অর্জনের প্রতিযোগিতার চেয়ে কাজের প্রতিযোগিতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।

একজন নেতার মনে দেশের প্রতি মমত্ববোধ, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সমাজের প্রতি আন্তরিকতা থাকা প্রয়োজন। নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া নেতৃত্বেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ।

দলীয়করণের বাইরে যোগ্যতার মূল্যায়ন জরুরি

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলীয় পরিচয় অনেক সময় যোগ্যতা ও দক্ষতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কিন্তু একটি শহর পরিচালনা করতে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নগর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান, আর্থিক স্বচ্ছতা, পরিকল্পনা গ্রহণের সক্ষমতা, নাগরিক সমস্যা বোঝার মানসিকতা এবং জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব।

সিলেট সিটি করপোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কিংবা দলীয় আনুগত্যের পাশাপাশি প্রার্থীর যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

দলীয় সমর্থন একজন প্রার্থীকে রাজনৈতিক শক্তি দিতে পারে, কিন্তু নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে তাঁকে যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। সিলেটের মানুষ এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করেন, যাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার পাশাপাশি শহরের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিয়েও ভাববেন।

প্রার্থী ঘোষণায় বিলম্ব কি বাড়াবে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা?

সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিযোগিতা চলতে থাকলে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি ও পারস্পরিক দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কে প্রার্থী হবেন, কে কাকে সমর্থন করবেন, কার রাজনৈতিক প্রভাব বেশি—এসব হিসাব-নিকাশে সাংগঠনিক শক্তি ও সময় ব্যয় হতে পারে।

তাই বিএনপির নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক অবস্থান এবং সিলেটের উন্নয়ন নিয়ে তাঁদের পরিকল্পনা বিবেচনা করে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া। দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিনির্ভর হলে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা কমানো এবং নেতাকর্মীদের ঐক্য ধরে রাখা সহজ হতে পারে।

তবে শুধু দ্রুত প্রার্থী ঘোষণা করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং নেতাকর্মীদের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়াও জরুরি। একই সঙ্গে যাঁরা মনোনয়ন পাবেন না, তাঁদেরও দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে।

সিলেটের উন্নয়নই হোক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মূল লক্ষ্য

সিলেট শুধু একটি নগরী নয়; এটি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্থনীতি ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এই শহরের নাগরিকদের প্রত্যাশা অনেক। যানজট নিরসন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পরিকল্পিত নগরায়ণ, নিরাপদ সড়ক এবং নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধি—এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

নগরবাসী দেখতে চান, তাঁদের নির্বাচিত নেতৃত্ব বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে কতটা আন্তরিক। তাঁরা দেখতে চান, রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের অবস্থান ও পদ-পদবি নিয়ে ব্যস্ত থাকার পরিবর্তে শহরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছেন।

সিলেটের উন্নয়ন কোনো একক ব্যক্তি কিংবা একটি দলের একার দায়িত্ব নয়। তবে যাঁরা নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় রয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই উচিত নিজেদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি নগরবাসীর প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দেওয়া।

নেতৃত্বের প্রকৃত সার্থকতা ক্ষমতায় নয়, জনকল্যাণে

রাজনীতিতে সবাই নেতৃত্ব দিতে চাইবেন, সম্মান অর্জন করতে চাইবেন—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু একজন প্রকৃত নেতার বড় পরিচয় হলো, তিনি নিজের জন্য কতটা অর্জন করলেন, তা নয়; বরং অন্যদের জন্য কতটা সুযোগ তৈরি করলেন এবং মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারলেন।

যাঁরা ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন, তাঁদের উচিত আত্মসমালোচনা করা—নিজেদের বর্তমান দায়িত্বগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে পালন করছেন? নতুন কোনো পদ গ্রহণ করলে মানুষের উপকার কতটা হবে? সেই পদে অন্য কোনো যোগ্য ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করলে কি আরও ভালো ফল পাওয়া সম্ভব?

এ প্রশ্নগুলো কোনো ব্যক্তিকে ছোট করার জন্য নয়; বরং রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহি ও দায়িত্ববোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য।

একটি দল তখনই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে ব্যক্তি নয়, নীতি প্রাধান্য পায়; পদ নয়, কাজ মূল্যায়িত হয়; আর ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শেষ কথা হলো, সিলেটের মানুষ শুধু নেতা দেখতে চান না, তাঁরা কার্যকর নেতৃত্ব দেখতে চান। তাঁরা শুধু পদ-পদবির প্রতিযোগিতা দেখতে চান না, তাঁরা উন্নয়নের প্রতিযোগিতা দেখতে চান।

বিএনপির নেতৃবৃন্দের প্রতি তাই বিনীত আহ্বান—ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে উঠে সিলেটের মানুষের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিন। দলের মধ্যে যোগ্য ও সৎ নেতৃত্বের বিকাশের সুযোগ তৈরি করুন। পদ-পদবি সীমিত কয়েকজনের মধ্যে কেন্দ্রীভূত না রেখে দায়িত্ব বণ্টনে ভারসাম্য, স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করুন।

কারণ, রাজনৈতিক পদ সাময়িক; কিন্তু মানুষের জন্য করা ভালো কাজ দীর্ঘস্থায়ী। ক্ষমতার পরিচয় একদিন মুছে যেতে পারে, কিন্তু মানুষের কল্যাণে যাঁরা নিজেদের নিয়োজিত করেন, তাঁদের অবদান মানুষের মনে বেঁচে থাকে।

সিলেটের উন্নয়ন, জনগণের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এখনই সময় আত্মজিজ্ঞাসার। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি পদ-পদবির রাজনীতি চাই, নাকি মানুষের কল্যাণে নিবেদিত রাজনীতি চাই?