দেশের উন্নয়নে জাপানের বিনিয়োগ চান প্রধানমন্ত্রী

দেশের উন্নয়নে জাপানের বিনিয়োগ চান প্রধানমন্ত্রী

চার দিনের সরকারি সফরে জাপানে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সফরের প্রথমদিন থেকেই তিনি ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

গতকাল জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (জাইকা) শীর্ষ প্রতিনিধি, দেশটির শীর্ষ ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়নে বিনিয়োগ সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

এর আগে গতকাল সকাল সোয়া ৯টার দিকে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা। এ সময় তাদের সেখানে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং জাপান বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন তারেক রহমান। এরপর যৌথ ঘোষণা আসার কথা রয়েছে।

জাইকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক ও সহায়তার আহ্বান: গতকাল স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে টোকিও ইম্পেরিয়াল হোটেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট তানাকা আকিহিকোর বৈঠক হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়নে সহায়তা কামনা করেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ-জাপান দক্ষতা উন্নয়ন অংশীদারত্ব, একটি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নগরী (টেকনোলজিক্যাল ভিলেজে এবং ইনোভেশন সিটি) প্রতিষ্ঠা এবং কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।

বৈঠকে বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন অগ্রাধিকার বিবেচনায় জাপানের কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণসহায়তা অব্যাহত রাখা এবং কারিগরি সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় গত বছরের মতো দেশের জ্বালানি চাহিদা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাজেট সহায়তা প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

উপ-প্রেস সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, আর্থসামাজিক অগ্রগতি এবং উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জাপানের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও গভীর করে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে জাইকার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সমৃদ্ধি অর্জনে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

উপ-প্রেস সচিব বলেন, বৈঠকে জাপানের সহায়তায় পরিচালিত বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোর অনুমোদন ও বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার বিষয়ও আলোচনা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জাইকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে তার বাংলাদেশ সফরের সময় ঢাকায় ফলপ্রসূ বৈঠকের কথা স্মরণ করেন। তিনি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা এবং জাইকার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এসব উদ্যোগ বাংলাদেশ ও জাপানের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি উভয় দেশের অভিন্ন সমৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সাক্ষাতে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান শাকিল, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। বৈঠকে জাইকার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হারা শোহেইসহ সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা:

এদিকে গতকাল সোমবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সফরে জাপানের রাজধানী টোকিওর নারিতা বিমানবন্দরে পৌঁছান। বাংলাদেশ এয়ার লাইন্সের বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সেখানে পৌঁছালে তাকে অভ্যর্থনা জানান জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ইয়াসুতাকা নাকাসোনে এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ ও প্রধানমন্ত্রী এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান। বিমান থেকে নেমে এলে প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। এ সময় সেখানে জাপান বিএনপির সভাপতি রেজী মীর, সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক মনি, প্রধান পৃষ্ঠপোষক এস ইসলাম নান্নু, জাপান বিএনপি সহসভাপতি মাসুম জাকির, দপ্তর সম্পাদক আবুল খায়ের ভূঁইয়া, ব্যবসায়ী নেতা কাজী সারওয়ার হাবিবসহ (সিআইপি) সংশ্লিষ্টরা।

বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রীকে মোটরশোভাযাত্রা সহকারে নিয়ে যাওয়ার হয় টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে। জাপান সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা এ হোটেলে অবস্থান করবেন।

প্রধানমন্ত্রী ১৭ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন:

তার প্রতিনিধিদলে আছেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী), বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, সচিব সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও আমজনতা দলের সাধারণ সম্পাদক মো. তারেক রহমান।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি হচ্ছে তারেক রহমানের চতুর্থ রাষ্ট্রীয় সফর। জাপান সফরের আগে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া এবং চীন সফর করেছিলেন। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন যোগ দিতে গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক সফর করেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ও জাপানের সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটাকে প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফর হিসেবেও দেখছেন।

জেবিপিএফএলের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ:

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লিগের (জেবিপিএফএল) একটি প্রতিনিধিদল। গতকাল বিকেল ৩টায় ইম্পেরিয়াল হোটেলে এ সাক্ষাৎ হওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টোকিও এসে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের সভাপতি ও জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের নেতৃত্বে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারে অব্যাহত অবদানের জন্য তারো আসোকে ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রী ২০০৬ সালে জাপান সফরকালে বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে তারো আসোর সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করেন।

উপ-প্রেস সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে তারো আসো বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

সাক্ষাৎকালে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে উভয়পক্ষ।

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর জোরদারে তারো আসোর সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে উপপ্রেস সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতা কামনা করেছেন।

বৈঠকে তারো আসো এবং জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের সদস্যদের বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের সফর দুই দেশের সংসদীয় বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও গভীর করবে।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের সভাপতি তারো আসোর সঙ্গে জাপানের শীর্ষ সংসদ সদস্যরা এবং দেশটির ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটনবিষয়ক মন্ত্রী তাতসুনৌরি ইবায়াশি উপস্থিত ছিলেন।

মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক:

বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) সভাপতি ও মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারেক রহমান। সোমবার জাপানের স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ১২টা ৪৫ মিনিট) এ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে মাসুমি কাকিনোকির নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়নে তার ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানান।

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ সময় মাসুমি কাকিনোকি দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উন্নত উৎপাদনশিল্পসহ সম্ভাবনাময় খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে এসব খাতে বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) আধুনিকায়ন এবং দেশে দ্বিতীয় একটি সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়ে জাপানের সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্কার, বিনিয়োগ-সংক্রান্ত অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারের মাধ্যমে জাপানি ব্যবসায়ীদের জন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ আরও সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আজ:

বাংলাদেশ ও জাপান দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচি। আজ মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় টোকিও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কান্তেইয়ে’ এ বৈঠক হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বলেন, মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খাতে জাপানের সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান নিয়ে আলোচনা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আজকে অভ্যর্থনা জানাবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক হবে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

পরনির্ভরশীলতার যুগ শেষ— হুমায়ূন কবির:

এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবির বলেছেন, দেশের সঙ্গে জাইকার এ সম্পর্কটি ঐতিহাসিক। এখন আমাদের পরনির্ভরশীলতার যুগ শেষ। টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, জাইকার প্রেসিডেন্ট আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলোয় এ সংস্থার সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন এবং একটি বিনিয়োগ অংশীদারত্বের (ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপের) মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উন্নয়নে বাংলাদেশের সঙ্গে কীভাবে যৌথভাবে কাজ করা যায়, তা উনি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকারের অধীনে, আমাদের বাংলাদেশ এবং জাইকা বাংলাদেশের উন্নয়নে এবং বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও জোরদার ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, দিনের সর্বশেষ কর্মসূচি ছিল নিপ্পন ফাউন্ডেশন এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের সম্মানসূচক চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার পক্ষ থেকে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে আয়োজিত একটি নৈশভোজ।

ইয়োহেই সাসাকাওয়া জাপানের একজন অত্যন্ত উঁচুমানের নাগরিক সমাজের ব্যক্তিত্ব। উনি আগেও বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচির প্রশংসা করেছেন। তিনি সন্ধ্যায় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন, যেখানে উনার ফাউন্ডেশনগুলোর ঊর্ধ্বতন (সিনিয়র) নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। আর আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মন্ত্রী ও উপদেষ্টাবৃন্দ এবং বিশেষ সহকারী যারা ছিলেন, তারাও উপস্থিত ছিলেন।

হুমায়ূন কবির আরও বলেন, বাংলাদেশের যে সরকার এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এ সরকার বাংলাদেশের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার। এটা ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের রক্তঝরা গণতান্ত্রিক উত্তরণের মাধ্যমে, বাংলাদেশের মানুষের ভোটের মাধ্যমে—জনগণের গণভোটের মাধ্যমে—এখন একটি শক্ত, মজবুত ও প্রতিষ্ঠিত সরকার। তো এর পররাষ্ট্রনীতি, এর অর্থনৈতিক নীতি এবং এর নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় আগ্রহ আছে। আমরা জাতিসংঘের (ইউএন) সভাপতিত্ব পেয়েছি, এখন ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি—তো স্বাভাবিকভাবেই এখন বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন অংশীজনের (স্টেকহোল্ডারদের) একটা আকর্ষণ আছে। এবং জাপানে আপনারা দেখছেন যে, অত্যন্ত আগ্রহের মাধ্যমে উনার এ সফরের আয়োজন হয়েছে।

আপনারা জানেন যে, পরনির্ভরশীলতার (এইড ডিপেন্ডেন্সির) যুগ এখন চলে গেছে। আর বাংলাদেশ সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে চলতে চায় না। বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং বিনিয়োগের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদার হবে।

নিপ্পন ফাউন্ডেশন চেয়ারম্যানের নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী:

জাপান সফরের প্রথম দিনে নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের অনারারি চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার আমন্ত্রণে নৈশভোজে অংশগ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এতে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী জুবাইদা রহমানও অংশগ্রহণ করেন। সোমবার রাতে জাপানের টোকিওতে মেইজি কিনেনকানের হানাগাসুমি রেস্তোরাঁয় এ নৈশভোজ আয়োজন করা হয় বলে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন জানিয়েছেন।

নৈশভোজে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খান এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার-২ কামরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া নিপ্পন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক তাকাশি আরিকাওয়া ও সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নৈশভোজে অংশ নেন।