সিলেট বোর্ডে এইচএসসির ফল বিপর্যয়: ১৩ বছরের সর্বনিম্ন পাসের হার, দায় কি শুধু শিক্ষার্থীদের?
সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ৫০.৯০ শতাংশে নেমে এসেছে। গত ১৩ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন পাসের হার। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার ২০৪ জন শিক্ষার্থী। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬০২। অর্থাৎ এক বছরে জিপিএ-৫ কমেছে ৩৯৮টি।
এবার মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ৭১ হাজার ৮৯৩ জন। ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করলেও তিনটি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেননি। এই ফলাফল শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা নয়, বরং শিক্ষা, পরিবার ও সামাজিক বাস্তবতার নানা দুর্বলতার প্রতিফলন বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেন ফলাফল এত খারাপ হলো?
সিলেট অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে পড়াশোনার পাশাপাশি বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা ও বিদেশমুখী মানসিকতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে পরিবারের সদস্যদের বসবাস এবং বিদেশে যাওয়ার সুযোগ অনেক শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষাজীবনের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
প্রবাসী আত্মীয়স্বজনের পাঠানো অর্থে অনেক পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পড়াশোনার অগ্রগতি ও নিয়মিত তদারকিতে ঘাটতি দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা আর্থিক নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যস্ত থাকলেও সন্তানের পড়াশোনায় পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ না দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনার দাবি রাখে।
আরও যেসব কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি
১. পরিবারের নজরদারির অভাব: অনেক অভিভাবক সন্তানের পড়াশোনা, উপস্থিতি ও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন না।
২. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা: শিক্ষকের সংকট, পাঠদানে ঘাটতি, নিয়মিত পরীক্ষা ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের বিশেষ সহায়তার অভাব।
৩. মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি: দীর্ঘ সময় বিনোদনে ব্যয় করায় পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ কমে যাওয়া।
৪. বিদেশমুখী মানসিকতা: উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে দ্রুত বিদেশ যাওয়ার চিন্তা কিছু শিক্ষার্থীর পড়াশোনার আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
৫. ভিত্তিগত শিক্ষার দুর্বলতা: মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি না হওয়া।
৬. পরীক্ষার প্রস্তুতি ও মূল্যায়নের ঘাটতি: নিয়মিত মডেল টেস্ট, দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ এবং মানসম্মত পাঠদানের অভাব।
উত্তরণের উপায় কী?
সিলেটের শিক্ষার মান ফিরিয়ে আনতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রশাসন ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে।
* অভিভাবকদের সন্তানের পড়াশোনা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির নিয়মিত খোঁজ নিতে হবে।
* প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের শুধু অর্থ পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সন্তানের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
* প্রতিটি কলেজে বিষয়ভিত্তিক দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে বিশেষ ক্লাস চালু করতে হবে।
* নিয়মিত পরীক্ষা, ফলাফল বিশ্লেষণ এবং অভিভাবক সভা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
* শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নকে নিরুৎসাহিত না করে উচ্চশিক্ষা, ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
* যেসব প্রতিষ্ঠানে পাসের হার অত্যন্ত কম বা শূন্য, সেসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ তদন্ত ও শিক্ষার মানোন্নয়ন কর্মসূচি নিতে হবে।
এখনই আত্মসমালোচনার সময়
এইচএসসির ফলাফল একটি পরীক্ষার পরিসংখ্যানমাত্র নয়; এটি একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির সক্ষমতারও গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
সিলেটের অনেক পরিবার প্রবাসী আয় ও আর্থিক সচ্ছলতার কারণে উন্নত জীবনযাপন করছে। কিন্তু সেই উন্নয়নের পাশাপাশি সন্তানদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, নৈতিকতা ও দক্ষতা অর্জন নিশ্চিত করা জরুরি।
বিদেশে যাওয়া অপরাধ নয়, বরং উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য এটি একটি সম্ভাবনা। কিন্তু শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল রেখে শুধু বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সিলেট বোর্ডের এবারের ফলাফল তাই একটি সতর্কবার্তা। এখনই পরিবার, কলেজ ও শিক্ষা প্রশাসনকে দায়িত্বশীল হতে হবে। নইলে আগামী বছরগুলোতেও এমন ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
প্রশ্ন এখন একটাই—সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে আমরা কি শুধু অর্থের ব্যবস্থা করছি, নাকি তাদের প্রকৃত শিক্ষিত ও দক্ষ মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলছি?

