সিলেটিদের হাত ধরে ব্রিটেনের কারি শিল্পের উত্থান

সিলেটিদের হাত ধরে ব্রিটেনের কারি শিল্পের উত্থান

বশির আহমদ : যুক্তরাজ্যের খাদ্যসংস্কৃতিতে কারি আজ একটি প্রতিষ্ঠিত নাম। ব্রিটেনের বড় শহর থেকে ছোট জনপদ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কারি রেস্তোরাঁ শুধু খাবারের ব্যবসা নয়, বরং অভিবাসীদের পরিশ্রম, সংগ্রাম ও উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার ইতিহাস বহন করছে। এই শিল্পের বিকাশে বাংলাদেশিদের, বিশেষ করে সিলেটি প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রিটেনে সিলেটিদের অভিবাসনের ইতিহাস বহু পুরোনো। ব্রিটিশ বাণিজ্যিক জাহাজে কর্মরত সিলেটি নাবিকদের একটি অংশ লন্ডনসহ বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ছোট খাবারের দোকান, ক্যাফে এবং আবাসনব্যবস্থা। এসব প্রতিষ্ঠান অভিবাসীদের খাবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, বিশেষ করে ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে, ব্রিটেনে সিলেটি অভিবাসীদের রেস্তোরাঁ ব্যবসায় অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। অনেকেই প্রথমে ওয়েটার, রান্নাঘরের সহকারী কিংবা শেফ হিসেবে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ পরিশ্রম ও সঞ্চয়ের মাধ্যমে পরে নিজের রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের হাত ধরেই ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরে কারি হাউসের বিস্তার ঘটে।

ব্রিটেনে প্রচলিত অনেক ‘ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট’ প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশি, বিশেষ করে সিলেটি উদ্যোক্তাদের মালিকানা ও পরিচালনায় গড়ে উঠেছে। ব্রিটিশ গ্রাহকদের স্বাদ ও চাহিদার সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় রান্নার সমন্বয় ঘটিয়ে তাঁরা এক স্বতন্ত্র খাদ্যসংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

লন্ডনের ব্রিক লেন এই ইতিহাসের অন্যতম প্রতীক। সিলেটি ও বৃহত্তর বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর ব্যবসা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক জীবনের বিকাশে এলাকাটি বিশেষ পরিচিতি অর্জন করে। তবে তাঁদের অবদান শুধু পূর্ব লন্ডনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের বহু শহর ও জনপদে সিলেটি উদ্যোক্তারা রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

এই ব্যবসাগুলো স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর প্রদান এবং খাদ্য সরবরাহসহ বিভিন্ন খাতের বিকাশে অবদান রেখেছে। একই সঙ্গে ব্রিটিশ সমাজে বাংলাদেশি অভিবাসীদের পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। কারি রেস্তোরাঁ হয়ে উঠেছে ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

তবে এই গৌরবময় ইতিহাসের পাশাপাশি বর্তমান বাস্তবতাও উদ্বেগজনক। ক্রমবর্ধমান ব্যবসায়িক ব্যয়, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, দক্ষ শেফের সংকট এবং অভিবাসননীতির পরিবর্তন অনেক কারি রেস্তোরাঁকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলেছে।