একটি অকাল মৃত্যু, আমাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা
গতকাল ১৩ বছরের একটি ছেলের অকাল মৃত্যুর খবর শুনে সত্যিই খুব আফসোস হয়েছিল। একটি কচি প্রাণ এভাবে অকালে চলে যাবে—এটা মেনে নেওয়া কঠিন।
কিন্তু আজ তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দেখে আমি একই সঙ্গে বিস্মিত ও বাকরুদ্ধ। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৬০/১৮০ সিসির মোটরসাইকেল নিয়ে চলাফেরা, নিজের চেয়ে ৭–৮ বছর বড় কিশোর-তরুণদের সঙ্গে অবাধে আড্ডা—এসব প্রশ্ন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আসে: একটি সন্তানের বেড়ে ওঠার পথে পরিবারের দায়িত্ব কতটা?
অবশ্যই, কোনো হত্যাকাণ্ডের জন্য হত্যাকারীকেই দায় নিতে হবে। তার অপরাধের দায় অন্য কারও ওপর চাপানো যায় না। কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হবে।
শিক্ষিত ও সামর্থ্যবান বাবা-মায়েরা যদি সন্তানের প্রতিটি আবদার পূরণ করতে থাকেন, তার চলাফেরা, বন্ধুবান্ধব, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে একেবারেই খোঁজ না রাখেন, তাহলে সন্তানটি কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী করছে—এসব জানবে কে?
সন্তানকে ভালোবাসা মানে তার সব আবদার পূরণ করা নয়।
ভালোবাসা মানে প্রয়োজনে তাকে ‘না’ বলতে পারাও।

অভিভাবকদের জন্য কিছু বাস্তব করণীয়
* সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, তা জানুন। শুধু বন্ধুর নাম জানলেই হবে না—তার বন্ধুদের পরিবার, বয়স ও তাদের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক সম্পর্কেও ধারণা রাখুন।
* কোথায় যাচ্ছে, কখন ফিরবে—জানুন। সন্তান বাইরে যাওয়ার সময় কোথায় যাচ্ছে এবং কার সঙ্গে যাচ্ছে, তা স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করুন। নির্দিষ্ট সময়ে না ফিরলে যোগাযোগ করুন।
* বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন স্বাধীনতা দেবেন না। সন্তান যা চাইছে, তা দেওয়ার সামর্থ্য থাকলেই দিতে হবে—এমন নয়। তার বয়স, পরিপক্বতা ও নিরাপত্তা বিবেচনা করুন।
* মোটরসাইকেল বা অন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের ক্ষেত্রে কঠোর হোন। ১৩–১৪ বছরের শিশুকে মোটরসাইকেল চালানোর সুযোগ দেওয়া কোনোভাবেই ‘আধুনিকতা’ বা ‘সন্তানের প্রতি ভালোবাসা’ নয়। নিরাপত্তা ও আইন—দুটিই গুরুত্বের সঙ্গে মানতে হবে।
* সন্তানের মোবাইল ও অনলাইন জগত সম্পর্কে সচেতন থাকুন। কার সঙ্গে কথা বলছে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, কোন গ্রুপ বা প্ল্যাটফর্মে যুক্ত—এসব সম্পর্কে বয়স উপযোগী ও স্বচ্ছ নিয়ম তৈরি করুন। প্রয়োজনে অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করুন।
* গোপনে নজরদারির বদলে খোলামেলা সম্পর্ক তৈরি করুন। সন্তান যেন বিপদে পড়লে ভয়ে বিষয়টি লুকিয়ে না রেখে বাবা-মাকে বলতে পারে। শাসনের পাশাপাশি বিশ্বাস ও বন্ধুত্বও দরকার।
* দরজা বন্ধ করে দীর্ঘ সময় একা থাকলে খোঁজ নিন—তবে অপমান বা ভয় দেখিয়ে নয়। সন্তান কী করছে, মানসিকভাবে কেমন আছে, কোনো সমস্যায় আছে কি না—সেটা বোঝার চেষ্টা করুন।
* সন্তানের আচরণ হঠাৎ বদলে গেলে গুরুত্ব দিন। নতুন বন্ধু, রাত জাগা, অতিরিক্ত গোপনীয়তা, আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা স্কুলে অনিয়ম—এসবকে শুধু ‘বয়সের দোষ’ বলে এড়িয়ে যাবেন না।
* সন্তানের সামনে অর্থ ও ক্ষমতার ভুল ব্যবহারকে উৎসাহ দেবেন না। টাকা দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করা যায়—এমন ধারণা সন্তানকে দেওয়া উচিত নয়। সীমা, দায়িত্ব এবং পরিণতি সম্পর্কে তাকে শেখাতে হবে।
* প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন। শুধু পড়াশোনা বা পরীক্ষার ফল নয়—বন্ধু, সম্পর্ক, অনলাইন জীবন, আনন্দ, ভয় ও সমস্যার কথাও শুনুন।
শেষ কথা
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাউকে হেয় করা আমার উদ্দেশ্য নয়। বরং চাই, এই মৃত্যু থেকে আমরা শিক্ষা নিই। শত শত পরিবার যেন নিজেদের সন্তানদের দিকে নতুন করে নজর দেয়।
সন্তান কোথায় যাচ্ছে—জানুন।
কার সঙ্গে যাচ্ছে—জানুন।
কী করছে—বোঝার চেষ্টা করুন।
অনলাইনে কী করছে—খেয়াল রাখুন।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সন্তানের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করুন, যাতে সে নিজের বিপদের কথা আপনাকে বলতে পারে।
আজকের একটি ভুল সিদ্ধান্ত একটি পরিবারের সারাজীবনের কান্নার কারণ হয়ে যেতে পারে।
একটি শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ শুধু তার নিজের দায়িত্ব নয়—এটা পরিবার, বন্ধু এবং পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
অকালপ্রয়াত শিশুটির জন্য দোয়া করি।
আল্লাহ তাকে পরকালে শান্তি ও মাগফিরাত দান করুন।
আর তার পরিবারকে এই অপূরণীয় শোক সহ্য করার শক্তি দিন। আমিন।

