বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের ভিসা বন্ধ করল যুক্তরাষ্ট্র
বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ ৭৫টি দেশের ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। গতকাল বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার খবর দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ওই কর্মকর্তা এ পরিকল্পনার বিস্তারিত জানাননি।
তবে ফক্স নিউজ পররাষ্ট্র দপ্তরের এসংক্রান্ত এক নথির বরাতে প্রথমে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘ইরান, রাশিয়া, সোমালিয়াসহ ৭৫টি দেশের সব ধরনের ভিসা প্রক্রিয়াকরণ স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র’ শিরোনামে ফক্স নিউজের খবরে বলা হয়, অনির্দিষ্টকালের জন্য ভিসা স্থগিতের এ কার্যক্রম শুরু হবে আগামী ২১ জানুয়ারি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ভিসা প্রসেসিং কার্যক্রম স্থগিত হওয়া দেশগুলো হচ্ছে—আফগানিস্তান, আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহামা, বাংলাদেশ, বার্বাডোজ, বেলারুশ, বেলিজ, ভুটান, বসনিয়া, ব্রাজিল, মায়ানমার, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কেপ ভার্দে, কলম্বিয়া, আইভরি কোস্ট, কিউবা, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ডোমিনিকা, মিসর, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, ফিজি, গাম্বিয়া, জর্জিয়া, ঘানা, গ্রানাডা, গুয়াতেমালা, গিনি, হাইতি, ইরান, ইরাক, জ্যামাইকা, জর্দান, কাজাখস্তান, কসোভো, কুয়েত, কিরগিজস্তান, লাওস, লেবানন, লাইবেরিয়া, লিবিয়া, ম্যাসিডোনিয়া, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টিনেগ্রো, মরক্কো, নেপাল, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, রাশিয়া, রুয়ান্ডা, সেন্ট কিটস ও নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাডাইনস, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, টোগো, তিউনিশিয়া, উগান্ডা, উরুগুয়ে, উজবেকিস্তান ও ইয়েমেন।
ফক্স নিউজের ওই প্রতিবেদন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে গত রাতে শেয়ার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সহকারী এবং হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওই ভিসা স্থগিত বা সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণাটি সব ধরনের ভিসার জন্য প্রযোজ্য কি না তা স্পষ্ট নয়। নিউজের প্রতিবেদনে সব ধরনের ভিসা স্থগিতের কথা বলা হলেও রয়টার্সের প্রতিবেদনে কেবল ‘ইমিগ্র্যান্ট’ ভিসা স্থগিত করার কথা বলা হয়েছে।
ফক্স নিউজের প্রতিবেদনের বলা হয়েছে, আগামী সপ্তাহ থেকে (২১ জানুয়ারি) স্থগিতের এ কার্যক্রম শুরু হবে। পুনর্মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত ভিসা দেওয়া বন্ধ থাকবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কনসুলার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে, ‘পাবলিক চার্জ’ নিয়মের অধীনে তাঁরা ভিসার আবেদন বাতিল করতে পারবেন। ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের বিষয়ে খড়্গহস্ত হয়েছেন। একের পর এক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে ব্যাপক আকারে ভিসা দেওয়া বন্ধের এ সিদ্ধান্ত এলো।
জানা গেছে, পাবলিক চার্জে পরিণত হতে পারে বলে মনে করা আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট ৭৫টি দেশের অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়াকরণ স্থগিত করছে।
এই নির্দেশিকায় কনসুলার অফিসাররা আবেদনকারীর স্বাস্থ্য, বয়স, ইংরেজি দক্ষতা, আর্থিক অবস্থা এবং এমনকি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাসেবার সম্ভাব্য প্রয়োজনসহ বিস্তৃত বিষয় বিবেচনা করে জনসাধারণের সুবিধার ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করা হয়, এমন আবেদনকারীদের ভিসা প্রত্যাখ্যান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বয়স্ক বা অতিরিক্ত ওজনের আবেদনকারীদের, যাদের অতীতে সরকারি নগদ সহায়তা বা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের কোনো ব্যবহার ছিল, তাদেরও প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেন, ‘পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ব ব্যবহার করে অযোগ্য সম্ভাব্য অভিবাসীদের বিবেচনা করবে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর জনসাধারণের অভিযোগে পরিণত হবে এবং আমেরিকান জনগণের উদারতাকে কাজে লাগাবে। এই ৭৫টি দেশ থেকে অভিবাসন স্থগিত রাখা হবে, যখন পররাষ্ট্র দপ্তর অভিবাসন প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন করবে, যাতে কল্যাণ ও জনসাধারণের সুবিধা গ্রহণকারী বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ রোধ করা যায়।’
তিনি জানান, এই পদক্ষেপের বাস্তবায়ন ২১ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে এবং বিভাগ ভিসা প্রক্রিয়াকরণের পুনর্মূল্যায়ন না করা পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য অব্যাহত থাকবে। উল্লেখ্য, ট্রাম্প প্রশাসন প্রথম বছরে এক লাখেরও বেশি ভিসা বাতিল করেছে।
জানা গেছে, পাবলিক চার্জের বিধান কয়েক দশক ধরে বিদ্যমান। তবে এটার প্রয়োগ ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। নতুন পদক্ষেপটির ব্যতিক্রমগুলো ‘খুব সীমিত’ এবং কেবল একজন আবেদনকারী পাবলিক চার্জ বিবেচনার বিষয়টি অনুমোদন করার পরেই অনুমোদিত হবে। বাইডেন প্রশাসনের অধীনে পাবলিক চার্জ রুলের ২০২২ সালের একটি সংস্করণে বিবেচিত সুবিধার পরিধি সীমিত করা হয়েছিল।
ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট দীর্ঘদিন ধরে কনসুলার অফিসারদের জনসাধারণের অভিযোগের ভিত্তিতে আবেদনকারীদের অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জনসাধারণের সুবিধার বিস্তৃত পরিসর অন্তভর্ভুক্ত করার জন্য সংজ্ঞাটি প্রসারিত করেছিলেন। এই সম্প্রসারণকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল এবং বাইডেন প্রশাসনের বাতিল করার আগে অংশগুলো শেষ পর্যন্ত অবরুদ্ধ করা হয়েছিল।
কিসের ভিত্তিতে এবার ৭৫টি দেশ চিহ্নিত করা হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। এর আগে গত ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশিদের মার্কিন বিজনেস (ব্যবসা) ও ট্যুরিস্ট (পর্যটক) ভিসার জন্য পাঁচ থেকে ১৫ হাজার ডলার জামানত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা চালু করে। এই ব্যবস্থাও আগামী ২১ জানুয়ারি চালু হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছিল। ভিসার ক্ষেত্রে জামানতব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে না ফেরার উচ্চহারের কথা উল্লেখ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ অর্থবছর শেষে ৩৮ হাজার ৯০ জন বাংলাদেশির যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হওয়ার কথা ছিল। তবে তাদের মধ্যে দুই হাজার ২১৩ জন বাংলাদেশি ভিসার মেয়াদ শেষে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে ভিসার মেয়াদ শেষে অবস্থানকারী বাংলাদেশির হার ৫.৭৩ শতাংশ।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে অন্য ইস্যুগুলোর পাশাপাশি ভিসা সহজ করার বিষয়েও আলোচনা করেছিলেন।
এমন এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রক্রিয়াকরণ স্থগিতাদেশ বা সাময়িক বন্ধের সিদ্ধান্ত এলো, যখন বিশ্বের অনেক দেশেই বাংলাদেশিদের ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। আগামী জুন-জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ হওয়ার কথা রয়েছে। ওই টুর্নামেন্টের খেলা দেখতেও বিশ্বের অনেক ফুটবলভক্ত যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

