কেন ফুঁসছে ইউরোপের তরুণেরা, কাঁপছে রাজপথ
ইউরোপের একের পর এক দেশে রাজপথে নামছেন তরুণেরা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, আবাসনসংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়ামসহ বিভিন্ন দেশের শহরে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও অনেক জায়গায় তা সংঘর্ষ ও লুটপাটে রূপ নিয়েছে।
ফ্রান্সে লাখো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। ইতালির রোম ও ফ্লোরেন্সে হাজারো মানুষ রাজপথে নেমেছেন। স্পেনের মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় একটি চত্বরে সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে তাঁবু টানিয়ে অবস্থান করছেন বিক্ষোভকারীরা।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও চলতি মাসে হাজারো তরুণ মিছিল করেছেন। বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়েছে।
আলবেনিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করছেন আন্দোলনকারীরা।
এই আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশই তরুণ। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহান্তে বার্সেলোনায় সংঘর্ষের ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের অর্ধেকের বেশি ছিল ১৮ বছরের কম বয়সী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াচ্ছে আন্দোলন
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থীরা টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিক্ষোভের আয়োজন করছেন। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোও এসব কর্মসূচিতে ভূমিকা রাখছে। এক দেশের আন্দোলন অন্য দেশের তরুণদের অনুপ্রাণিত করছে। ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ ভবনের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন প্রতিবেশী বেলজিয়ামেও ছড়িয়ে পড়েছে।
গ্রিসের ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইয়ানিস পাপানিকোলাউ এএফপিকে বলেন, তাদের স্কুল ভবনগুলোর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। ফ্রান্সের আন্দোলন গ্রিসেও পরিবর্তনের প্রেরণা জোগাতে পারে বলে তিনি আশা করেন।
আবাসন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
তরুণদের ক্ষোভের পেছনে শিক্ষা খাতের সমস্যার পাশাপাশি রয়েছে অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবেশগত সংকট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তাদের উদ্বিগ্ন করছে।
মাদ্রিদ ও লিসবনে আবাসনের অতিরিক্ত ব্যয় আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ। লিসবনের ২৬ বছর বয়সী পিএইচডি গবেষক ক্যারোলিনা ক্রুজ রয়টার্সকে বলেন, তার বাড়িভাড়ার চুক্তির মেয়াদ শেষের পথে। পড়াশোনা করেও নিজের আবাসন নিশ্চিত করতে পারছেন না তিনি।
ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের পরিচালক মার্ক লিওনার্ডের মতে, ২০০৭-০৮ সালের আর্থিক সংকট, ২০১৫ সালের অভিবাসন সংকট, কোভিড মহামারি, মূল্যস্ফীতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পর সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ- একের পর এক সংকটের প্রভাব জমতে জমতে এখন রাজপথে ক্ষোভ হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও কঠোর পদক্ষেপ
বিক্ষোভে সহিংসতার জন্য ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো চরম বামপন্থী গোষ্ঠী এবং সুযোগসন্ধানীদের দায়ী করেছে। তবে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিভিন্ন দেশে সরকার হাজারো মানুষকে গ্রেফতার করেছে। ইতালি ও ফ্রান্স সহিংসতায় ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের নীতি গ্রহণের কথা জানিয়েছে। ইতালিতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির জন্য তাদের অভিভাবকদের দায়ী করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই অস্থিরতা অভিবাসনবিরোধী ও জাতীয়তাবাদী দলগুলোর রাজনৈতিক সমর্থন বাড়াতে পারে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, জার্মানি ও পোল্যান্ডে এসব দলের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে।
চ্যাথাম হাউসের ইউরোপবিষয়ক পরিচালক গ্রেগোয়ার রুসের মতে, ইউরোপের মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা সংকটে পড়েছে। কর দেওয়ার বিনিময়ে মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল জীবন পাওয়ার যে সামাজিক প্রত্যাশা ছিল, তা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তরুণদের চলমান বিক্ষোভ সেই অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ। তবে এই আন্দোলন কত দিন স্থায়ী হবে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সূত্র: বিবিসি

