মিডলইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ
কেন স্বাধীন ইরানকে কখনোই সহ্য করতে পারে না পশ্চিমা বিশ্ব?
ইরানের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রশ্নে পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি কয়েক দশক ধরে একই বৃত্তে আবর্তিত হচ্ছে। ১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে আজকের দিনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে মার্কিন-ইসরায়েলি সম্ভাব্য হামলার হুমকি; সবকিছুর মূলে রয়েছে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা।
বিশ্লেষক সুমাইয়া ঘানুশির সাম্প্রতিক নিবন্ধে উঠে এসেছে কীভাবে ইরানের তেল জাতীয়করণ এবং স্বাধীন নীতি গ্রহণই দেশটিকে পশ্চিমা শক্তির চিরশত্রুতে পরিণত করেছে।
বর্তমানে ভারত মহাসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর উপস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ডেস্ট্রয়ার মোতায়েনকে নিছক কোনো মহড়া হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যুদ্ধের এই সাজসাজ রব এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা নথির মাধ্যমে ইরানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কথিত নৃশংসতার অভিযোগ তোলা আসলে একটি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রেক্ষাপট তৈরির কৌশল।
বিশেষ করে ইসরায়েল যখন ইরানের বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের তথ্য দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্ররোচিত করছে, তখন প্রশ্ন উঠছে এই তথ্যের নিরপেক্ষতা নিয়ে। কারণ যে রাষ্ট্রটি দীর্ঘদিন ধরে তেহরানে শাসন পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে আসছে, তাদের দেওয়া তথ্যকে ধ্রুব সত্য হিসেবে গ্রহণ করা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিপজ্জনক।
ইরান বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং দশকের পর দশক ধরে চলা অর্থনৈতিক অবরোধ সাধারণ মানুষকে রাজপথে ঠেলে দিয়েছে। তবে এই অসন্তোষকে পুঁজি করে ১৯৫৩ সালের সেই 'অপারেশন অ্যাজাক্স'-এর আধুনিক সংস্করণ মঞ্চস্থ করার চেষ্টা চলছে বলে মনে করা হচ্ছে। সে সময় ব্রিটিশরা ইরানের তেলের মাত্র ১৬ শতাংশ লভ্যাংশ দিত, আর তা জাতীয়করণ করায় সিআইএ এবং এমআই-সিক্স মিলে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে শাহকে পুনর্বহাল করেছিল।
আজ সেই একই চিত্রনাট্য ফিরে আসছে। যেখানে ইরান থেকে চীনে তেল রপ্তানি বন্ধ করার মাধ্যমে বেইজিংকেও চাপে ফেলার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা কাজ করছে। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চীনের সামুদ্রিক তেল আমদানির ১৩ শতাংশ অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল তেল আসে ইরান থেকে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মোসাদ সরাসরি ইরানি জনগণকে উসকানি দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাহর ছেলে রেজা পাহলভীকে বিকল্প নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় পশ্চিমা শক্তিগুলো ইরানের সার্বভৌমত্বকে ধ্বংস করে দেশটিকে খণ্ডবিখণ্ড করার নীল নকশা বাস্তবায়ন করতে চায় বলে আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে।
১ ফেব্রুয়ারি ইরানি বিপ্লবের বার্ষিকী সামনে রেখে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি এটাই প্রমাণ করে, ১৯৫৩ সাল থেকে শুরু করে আজও ইরান নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যে চেষ্টা করছে, পশ্চিম সেটাকে ক্ষমা করতে পারছে না।

