২০০৮ সালের সেই শিহাব শাহরিয়ার—একটি হৃদয়স্পর্শী স্মৃতি, একটি অসমাপ্ত লড়াই
২৯ সেপ্টেম্বর ২০০৮। আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে, একটি ছোট্ট শিশুর জীবন বাঁচানোর আকুতি ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো ব্রিটেনজুড়ে। সেই শিশুটির নাম ছিল শিহাব শাহরিয়ার। মাত্র আট বছরের নিষ্পাপ একটি শিশু, যে দুরারোগ্য ক্যান্সারের সঙ্গে জীবন-মৃত্যুর লড়াই করছিল।
শিহাবের বাবা-মা—দুজনেই শিক্ষক। সন্তানের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা তাদের পক্ষে ছিল অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। সেই কঠিন সময়ে সাংবাদিক শামসুল করিম লিটন ভাই বিষয়টি আমাদের সামনে তুলে ধরেন। আমরা তখন বাংলা টিভিতে কাজ করতাম। কোনো দ্বিধা না করে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম—শিহাবকে বাঁচানোর জন্য মানুষকে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাব।
আল্লাহর অশেষ রহমতে এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের অকৃত্রিম ভালোবাসায় যে সাড়া আমরা পেয়েছিলাম, তা আজও অবিশ্বাস্য মনে হয়। প্রথম দিনের সাড়া এতটাই অভাবনীয় ছিল যে, আমাদের আরও একদিন ফান্ডরেইজিং চালিয়ে যেতে হয়। দুই দিনের সেই মানবিক উদ্যোগে আমরা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলাম ৫২ হাজার পাউন্ড এর মধ্যে সমপরিমাণ ৬০ লক্ষ টাকা। আমরা শিহাব শাহরিয়ারের পরিবারের হাতে তুলে দিতে পেরেছিলাম, যাতে সিঙ্গাপুরে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়।
আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সিংগাপুর মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের ডা: জাকের উল্লাহ ভাইয়ের এর আন্তরিক তত্ত্বাবধান, লিটন ভাইয়ের নিরলস সহযোগিতা এবং অসংখ্য মানুষের দোয়া ও ভালোবাসা—সবকিছু নিয়েই শুরু হয়েছিল শিহাবের চিকিৎসা।
কিন্তু…
মানুষ চেষ্টা করতে পারে, ফলাফলের মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ।
সিঙ্গাপুরে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। বিশ্বের উন্নত চিকিৎসা, দক্ষ চিকিৎসক—সবই ছিল। তবুও আমরা আমাদের প্রিয় শিহাবকে আর ফিরিয়ে আনতে পারিনি। আল্লাহ তাআলা তাকে যতদিন হায়াত দান করেছিলেন, ততদিনই সে এই পৃথিবীতে ছিল। পৃথিবীর কোনো ডাক্তার, কোনো বিজ্ঞানী, কোনো বিশেষজ্ঞ আল্লাহর ফয়সালাকে পরিবর্তন করতে পারেননি।
আজ বহু বছর পর, হঠাৎ সেই পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিংটি হাতে এল। মুহূর্তেই যেন ফিরে গেলাম ২০০৮ সালের সেই দিনগুলোতে। চোখের সামনে ভেসে উঠল ছোট্ট শিহাবের মুখ, তার অসহায় বাবা-মায়ের অশ্রুসিক্ত চোখ, আর হাজারো মানুষের ভালোবাসায় গড়ে ওঠা এক অনন্য মানবিক আন্দোলনের স্মৃতি।
সত্যি বলতে, বুকের ভেতরে জমে থাকা সেই চাপা কষ্ট আর একা বহন করতে পারছিলাম না। তাই আপনাদের সঙ্গে এই স্মৃতিটুকু ভাগ করে নিলাম।
আজ জাস্ট হেল্প ফাউন্ডেশন হাঁটি হাঁটি পা পা করে ২০ বছরে পদার্পণ করেছে। এই দীর্ঘ পথচলায় আপনাদের ভালোবাসা, দোয়া, পরামর্শ এবং আর্থিক সহযোগিতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সেই শিহাবকে আমরা বাঁচাতে পারিনি—এটি আমাদের জীবনের এক গভীর বেদনা। কিন্তু সেই ঘটনার মধ্য দিয়েই আমরা শিখেছি, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিটি প্রচেষ্টা কখনোই বৃথা যায় না। হয়তো জীবন বাঁচানো সব সময় সম্ভব হয় না, কিন্তু একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাকে আশা দেওয়া এবং তার পরিবারের কষ্ট ভাগ করে নেওয়াই মানবতার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
আজ আমরা জাস্ট হেল্প আই হসপিটাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের স্বপ্ন—আরও অসংখ্য অসহায় মানুষের চোখে আলো ফিরিয়ে দেওয়া।
আপনাদের কাছে বিনীত আবেদন, আমাদের এই মানবিক যাত্রায় পাশে থাকুন। আপনাদের সহযোগিতা, দোয়া এবং ভালোবাসাই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার সাহস।
আল্লাহ তাআলা শিহাব শাহরিয়ারকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন এবং তার পরিবারকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমীন।
মানুষ চলে যায়, কিন্তু মানবতার জন্য করা কাজ কখনো হারিয়ে যায় না। সেই ভালোবাসার ইতিহাসই আজও আমাদের এগিয়ে চলার প্রেরণা।

