বিমানের যাত্রীদের আচরণ: আমরা কোথায় যাচ্ছি? একজন যাত্রী হিসেবে আমাদের কি দায়িত্ব

বিমানের যাত্রীদের আচরণ: আমরা কোথায় যাচ্ছি?  একজন যাত্রী হিসেবে আমাদের কি দায়িত্ব

আজ একটি অত্যন্ত বিব্রতকর ও লজ্জাজনক বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই—বিমানে আমাদের যাত্রীদের আচরণ।

আমরা যখন বিদেশি কোনো এয়ারলাইনসে যাত্রী হিসেবে ভ্রমণ করি—কাতার এয়ারওয়েজ হোক, এমিরেটস হোক, সৌদি এয়ারলাইন্স,ইজিজেট কিংবা অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস—তখন আমাদের আচরণ হঠাৎ করেই বদলে যায়। আমরা নিয়ম মেনে চলি, লাইনে দাঁড়াই, কর্মীদের কথা শুনি, নিজের সিটে বসি, অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করি না। যেন আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ জাতি।

কিন্তু একই মানুষ যখন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে ওঠেন, তখন যেন ভদ্রতা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য—সবকিছু বিমানবন্দরের গেটের বাইরে রেখে আসেন!

বিমানে ওঠার আগেই শুরু হয় লাগেজ নিয়ে টানাটানি। নির্ধারিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত মালামাল নিয়ে আসা, লাইনে দাঁড়াতে অনীহা, ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি, কে আগে যাবে—এই নিয়ে হইচই। সামান্য ফ্লাইট বিলম্ব হলে তো কথাই নেই। এয়ারলাইনসের কর্মী বা কর্মকর্তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়, যেন তারা ব্যক্তিগতভাবে আমাদের ফ্লাইট আটকে রেখেছেন!

তারপর বিমানে ওঠার পালা।

সিটে বসার আগেই শুরু হয় আরেক অধ্যায়। কার হ্যান্ড লাগেজ কোথায় থাকবে, কার সুটকেস কোন ওভারহেড বিনে যাবে, কে আগে উঠবে, কে পরে উঠবে—এসব নিয়ে তর্ক-বিতর্ক। একজনের জায়গায় আরেকজনের লাগেজ রাখলেই শুরু হয় বাকবিতণ্ডা।

সিটে বসার পরও শান্তি নেই।

কেউ সিট সম্পূর্ণ পেছনে হেলিয়ে দেন, কেউ সামনের যাত্রীর অসুবিধার কথা একবারও ভাবেন না। অথচ একটি বিমানে কয়েকশ মানুষ একসঙ্গে কয়েক ঘণ্টা ভ্রমণ করছেন। সেখানে সামান্য সৌজন্য, সামান্য বিবেচনাবোধ এবং সামান্য ধৈর্য কি এতই কঠিন?

এরপর আসে খাবারের পালা।

কেবিন ক্রু খাবার পরিবেশন করছেন। কেউ বলছেন এটা চাই, কেউ বলছেন ওটা চাই। কোনো একটি খাবার শেষ হয়ে গেলে শুরু হয় অভিযোগ, তর্ক-বিতর্ক। অবশ্যই এখানে এয়ারলাইনসেরও দায় আছে। তারা যদি জানে কোনো নির্দিষ্ট খাবারের চাহিদা বেশি, তাহলে যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত খাবার রাখার ব্যবস্থা করা উচিত। কিন্তু এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি থাকলেও একজন যাত্রীর অশোভন আচরণ কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আর সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয়—কখনো কখনো এমন যাত্রীও দেখা যায়, যাদের আচরণে পাশে বসা অন্য যাত্রী পর্যন্ত অস্বস্তিতে পড়েন। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও অন্যের প্রতি ন্যূনতম সম্মান—এগুলোও ভ্রমণশিষ্টাচারের অংশ।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য দেখা যায় যখন কোনো যাত্রী সামান্য বিষয় নিয়ে আকাশের মধ্যে অন্য যাত্রীর সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন।

ভাবুন একবার—আমরা কয়েক হাজার ফুট ওপরে আছি। চারপাশে শত শত মানুষের জীবন। সেখানে সামান্য কথাকাটাকাটি কীভাবে মারামারিতে পরিণত হয়?

এটা শুধু একজন ব্যক্তির সমস্যা নয়। একজনের অসভ্যতা অনেক সময় পুরো দেশের মানুষের ভাবমূর্তির ওপর ছাপ ফেলে।

তারপর শুরু হয় অবতরণের সময়ের আরেক নাটক।

বিমান এখনো পুরোপুরি থামেনি, সিটবেল্টের নির্দেশনা শেষ হয়নি—এর মধ্যেই কেউ মাথার ওপরের লাগেজের কেবিন খুলছেন। কেবিন ক্রু বারবার বলছেন, “দয়া করে বসুন।” কিন্তু অনেকেই যেন কোনো কথাই শুনছেন না।

একজন দাঁড়ালে আরেকজন দাঁড়ান। তারপর আরেকজন। মুহূর্তের মধ্যে কয়েক ডজন মানুষ দাঁড়িয়ে যান। অথচ বিমান তখনও চলমান।

এ কেমন তাড়াহুড়ো?

কোথায় যাবেন? সামনে গিয়ে কি কোনো পুরস্কার অপেক্ষা করছে?

বিমান অবশেষে গেটে পৌঁছালে শুরু হয় নামার প্রতিযোগিতা। কে আগে বের হবে, কে আগে দরজায় পৌঁছাবে—এ যেন জীবন-মরণ লড়াই!

তারপর ইমিগ্রেশন।

তারপর লাগেজ বেল্ট।

সেখানেও একই দৃশ্য—ট্রলি নিয়ে ধাক্কাধাক্কি, কে আগে দাঁড়াবে, কে আগে লাগেজ নেবে। কখনো ভুল করে অন্যের লাগেজ নিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই রকম দেখতে লাগেজ দেখে একজন আরেকজনের ব্যাগ নিয়ে ফেলছেন। তারপর শুরু হচ্ছে তর্ক-বিতর্ক।

“এটা আমার ব্যাগ।”

“দেখতে তো আমারটার মতো!”

দেখতে আপনারটার মতো হলেই কি সেটা আপনার হয়ে গেল?

একটু সচেতনতা, একটু ধৈর্য, একটু সৌজন্য—এই সামান্য বিষয়গুলো আমরা কেন শিখতে পারছি না?

সবশেষে বিমানবন্দরের বাইরে বের হওয়ার পরও সেই একই প্রতিযোগিতা—কে আগে যাবে, কার গাড়ি কোথায় দাঁড়িয়েছে, কে কাকে আগে নেবে, কার আত্মীয় কোথায় দাঁড়িয়ে আছে—সব মিলিয়ে একটি সাধারণ যাত্রা পরিণত হয় এক বিরাট বিশৃঙ্খলায়।

প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই এমন?

বিদেশি এয়ারলাইনসে উঠলে আমরা নিয়ম মানি, অথচ নিজের দেশের এয়ারলাইনসে উঠলে কেন সেই নিয়ম ভুলে যাই?

সমস্যাটা কি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের?

আংশিকভাবে তাদেরও দায় আছে—ব্যবস্থাপনা, যাত্রী নিয়ন্ত্রণ, খাবার, গ্রাউন্ড সার্ভিস, বোর্ডিং প্রক্রিয়া—এসব ক্ষেত্রে উন্নতির সুযোগ অবশ্যই আছে।

কিন্তু সব দোষ কি তাদের?

না।

একজন যাত্রী হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে।

আমরা যদি বিদেশের মাটিতে আইন-কানুন মেনে চলতে পারি, বিদেশি এয়ারলাইনসে শৃঙ্খলা মানতে পারি, তাহলে নিজের দেশের এয়ারলাইনসে উঠেই কেন আমাদের আচরণ বদলে যাবে?

আমাদের সমস্যা শুধু বিমানবন্দরে নয়। সমস্যা আমাদের অভ্যাসে, সামাজিক শিষ্টাচারে এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করার মানসিকতায়।

আমরা ধর্মের কথা বলি, দেশপ্রেমের কথা বলি, সম্মানের কথা বলি। কিন্তু বাস্তবে একজন অপরিচিত মানুষের কয়েক ইঞ্চি জায়গা, কয়েক মিনিট সময়, অথবা তার সামান্য স্বাচ্ছন্দ্যটুকু পর্যন্ত আমরা সম্মান করতে পারি না।

এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

আর একটা কথা—কয়েকজন মানুষের খারাপ আচরণের জন্য পুরো জাতিকে অপমান করা বা জাতিগতভাবে নিজেদের হেয় করাও সমাধান নয়। বরং আমাদের প্রত্যেককে নিজের জায়গা থেকে পরিবর্তন শুরু করতে হবে।

বিমান কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়। বিমানবন্দর কোনো দৌড় প্রতিযোগিতার মাঠ নয়। লাগেজ বেল্ট কোনো কুস্তির মঞ্চ নয়। আর একজন সহযাত্রী আপনার প্রতিদ্বন্দ্বীও নন।

আমরা সবাই একই বিমানের যাত্রী। একই দেশের নাগরিক। একই সমাজের মানুষ।

বিদেশে গিয়ে যদি আমরা শৃঙ্খলা মানতে পারি, তাহলে নিজের দেশেও পারব—শুধু ইচ্ছেটা থাকতে হবে।

আল্লাহ আমাদের ধৈর্য দিন, বিবেক দিন, অন্যকে সম্মান করার শিক্ষা দিন। আমাদের আচরণের মাধ্যমে যেন নিজের, পরিবারের এবং দেশের সম্মান নষ্ট না হয়।

দেশের পাসপোর্ট আমাদের পরিচয় বহন করে। কিন্তু পৃথিবীর সামনে আমাদের আচরণই বলে দেয়—আমরা কেমন মানুষ।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে বোঝার তৌফিক দিন এবং নিজেদের ভুলগুলো সংশোধন করার শক্তি দিন।
আমীন। 

মিজানুর রহমান মিজান 
ম‍্যানচেষ্টার।