সিলেটের নগর উন্নয়নে নতুন প্রত্যাশা: ভালো উদ্যোগের পাশে দাঁড়ানোই সময়ের দাবি

সিলেটের নগর উন্নয়নে নতুন প্রত্যাশা: ভালো উদ্যোগের পাশে দাঁড়ানোই সময়ের দাবি
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী

সিলেট শুধু একটি শহরের নাম নয়; এটি আমাদের আবেগ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি জনপদ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য সিলেটপ্রবাসী আজও দূর থেকে নিজের শহরের উন্নয়ন, সৌন্দর্য ও মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের দিকে গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকেন। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। দেশের বাইরে ইংল্যান্ডে অবস্থান করলেও গত কিছুদিন ধরে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন কার্যক্রম এবং নগর উন্নয়ন নিয়ে নেওয়া উদ্যোগগুলো আমি আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ্য করছি।
বিশেষ করে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক জনাব আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিচ্ছন্নতা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, তা ইতিবাচকভাবে দেখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
এ কথা বলার শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—এটি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নয়। একজন সিলেটবাসী হিসেবে এবং সিলেটের উন্নয়ন প্রত্যাশী একজন নাগরিক হিসেবে ভালো উদ্যোগের প্রশংসা করা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আহ্বান জানানোই এই লেখার উদ্দেশ্য।

জলাবদ্ধতা: সিলেটের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ
সিলেট নগরীর অন্যতম বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। অনেক সময় বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। নগরীর উপশহরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বর্ষা মৌসুমে এই দুর্ভোগ আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
ড্রেন, নালা, খাল ও জলাধারের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এই সমস্যাকে দীর্ঘদিন ধরে জটিল করে তুলেছে। নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করা, ময়লা-আবর্জনা ফেলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দেওয়া এবং জলাধারগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এই বাস্তবতায় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দিকে বাড়তি নজর দেওয়ার উদ্যোগ অবশ্যই স্বাগত জানানোর মতো।
তবে শুধু সিটি কর্পোরেশনের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা, ড্রেনে প্লাস্টিক ও বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। একটি শহরকে পরিষ্কার রাখা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিকদেরও নৈতিক দায়িত্ব।

পরিচ্ছন্নতা থেকেই শুরু হোক নগর সৌন্দর্য
একটি শহরকে আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন করতে হলে প্রথমেই তাকে পরিষ্কার করতে হয়। পরিচ্ছন্নতা ছাড়া কোনো সৌন্দর্যায়নই টেকসই হতে পারে না।
সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং পর্যটনের একটি বড় কেন্দ্র। দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ এখানে আসেন। তাই সিলেটের রাস্তাঘাট, ফুটপাত, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ও জনপরিসরকে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখা শুধু নাগরিক সুবিধার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সিলেটের ভাবমূর্তিও জড়িত।
এই জায়গায় প্রশাসক জনাব আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও পরিকল্পিত ও ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। মশা নিধনের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। আজ পরিষ্কার করে আগামীকাল আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেলে হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, জবাবদিহিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

যানজটমুক্ত সিলেট এখন সময়ের দাবি
পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সিলেট নগরীর যানজটও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমস্যা। জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, আম্বরখানা, এয়ারপোর্ট রোডসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে যানজট মানুষের দৈনন্দিন চলাচলকে কঠিন করে তুলছে।
অপরিকল্পিত পার্কিং, ফুটপাত দখল, রাস্তার  উপর যত্রতত্র সিএনজি ষ্টেন্ড ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা এবং অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক বড় বড় গেট, ব্যানার ও ফেস্টুন নগরীর স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দল যদি নিজেদের অনুষ্ঠান, সংবর্ধনা কিংবা প্রচারণার ক্ষেত্রে শহরের প্রধান সড়ক ও জনসাধারণের চলাচলের জায়গা দখল করে বড় বড় গেট ও ব্যানার স্থাপন থেকে বিরত থাকে, তাহলে অন্যদেরও একই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি হবে।
সিলেটকে সুন্দর করতে হলে শুধু প্রশাসনকে নয়, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

হাসন মার্কেট নিয়ে প্রত্যাশা
সম্প্রতি হাসন মার্কেটকে আধুনিকায়ন ও উন্নত শপিং সেন্টারে রূপ দেওয়ার বিষয়ে প্রশাসকের পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে অনেক সময় বড় ব্যবধান থেকে গেছে।
তাই হাসন মার্কেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা অত্যন্ত জরুরি।
যদি এই উদ্যোগ বাস্তবে রূপ নেয় এবং একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও নাগরিকবান্ধব বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে, তাহলে এটি সিলেট নগরীর সৌন্দর্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

প্রশাসনের সমালোচনা থাকবে, তবে ভালো কাজের স্বীকৃতিও প্রয়োজন
সিটি কর্পোরেশনের মতো একটি বড় প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী, বহু ওয়ার্ড এবং বিপুলসংখ্যক নাগরিকের সেবা নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে কঠিন দায়িত্ব। একজন প্রশাসকের পক্ষে প্রতিটি বিষয় নিজে তদারকি করা সম্ভব নয়।
তবে যেখানে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, সেখানে অবশ্যই কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে কেউ যদি ভালো কাজ করার চেষ্টা করেন, তাহলে সেই উদ্যোগের স্বীকৃতিও দিতে হবে।
ভালো কাজকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অস্বীকার করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ভুল কাজকে সমর্থন করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত খুব সহজ—ভালো কাজ হলে প্রশংসা, ভুল হলে গঠনমূলক সমালোচনা।
সিলেট সবার
জনাব আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর কাছে এখন সিলেটবাসীর প্রত্যাশা অনেক। তিনি যে দায়িত্বে রয়েছেন, সেই দায়িত্ব দল-মতের ঊর্ধ্বে। সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডের মানুষ তাঁর সেবার আওতাভুক্ত। তাই তাঁর প্রতিটি উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা এবং সিলেটকে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করা।
আমরা চাই একটি জলাবদ্ধতামুক্ত সিলেট।
আমরা চাই একটি পরিচ্ছন্ন সিলেট।
আমরা চাই একটি যানজটমুক্ত সিলেট।

আমরা চাই একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক সিলেট।
আমরা চাই এমন একটি নগরী, যেখানে নাগরিকরা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারবেন এবং দেশ-বিদেশের মানুষ সিলেটের সৌন্দর্য দেখে গর্বিত হবেন।
এই লক্ষ্য অর্জন শুধু প্রশাসকের একার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সর্বোপরি নাগরিক সহযোগিতা।
সিলেটের উন্নয়নে যিনি কাজ করবেন, তিনি যে দলেরই হোন না কেন, তাঁর ভালো উদ্যোগের পাশে দাঁড়ানো উচিত। কারণ ক্ষমতা কিংবা পদ চিরস্থায়ী নয়; কিন্তু একটি শহরের উন্নয়ন প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে।
তাই প্রশাসক জনাব আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর প্রতি প্রত্যাশা—পরিচ্ছন্নতা ও জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ আরও জোরদার করার পাশাপাশি যানজট, ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত পোস্টার-ব্যানার এবং নগর ব্যবস্থাপনার অন্যান্য সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিন।
কথা ও কাজের মধ্যে যদি সামঞ্জস্য থাকে, পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়নে রূপ নেয় এবং নাগরিক সেবা যদি সত্যিকার অর্থে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে সিলেটবাসী অবশ্যই সেই কাজকে মূল্যায়ন করবে।
সিলেট আমাদের সবার। এই শহরের উন্নয়নও আমাদের সবার দায়িত্ব।
ভালো উদ্যোগের সমালোচনা নয়, বরং গঠনমূলক সহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় জবাবদিহিতার মাধ্যমে আমরা যদি একসঙ্গে এগিয়ে আসি, তাহলেই গড়ে উঠতে পারে আমাদের স্বপ্নের সিলেট—একটি পরিচ্ছন্ন, সুন্দর, আধুনিক, যানজটমুক্ত ও বাসযোগ্য নগরী।
সিলেটের সেই সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায়—প্রশাসক জনাব আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর চলমান ইতিবাচক উদ্যোগগুলো সফল হোক। সিলেটবাসীর কল্যাণে তাঁর কাজ আরও বিস্তৃত হোক—

মিজানুর রহমান মিজান 
এডিটর : জাষ্ট হেল্প নিউজ.কম 
ইংল্যান্ড ।