বার্নহ্যামের চমক নাকি সত্যিকার বদল

বার্নহ্যামের চমক নাকি সত্যিকার বদল

নেসরিন মালিক: অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এখন দারুণ সময় পার করছেন। অনেক দিন এমন প্রধানমন্ত্রী দেখিনি, যাকে দেখে মনে হয় তিনি নিজের কাজ সত্যিই উপভোগ করছেন। কয়েক দিন আগে একটি ভিডিও দেখলাম। সেখানে বার্নহ্যাম বলছিলেন, এক সময় ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ার উপযোগিতা নিয়ে তার বাবার সঙ্গে তর্ক হতো। তিনি কবিতা উদ্ধৃত করলেন। শব্দের ওপর দখল অর্জনের গুরুত্ব নিয়েও কথা বললেন। দৃশ্যটি দেখে কিয়ার স্টারমারের জন্য মায়াই লাগছিল।

লেবার পার্টির নেতা এবং পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্টারমারের পুরো সময় এমন একটি মুহূর্ত দেখা যায়নি, যা পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্ত। তার ভেতরের স্বাভাবিক অনুভূতি যেন কখনো বাইরের আবরণ ভেদ করে বের হতে পারেনি। আর তার উত্তরসূরি যেন স্বাভাবিকতায় ভরপুর। এর গুরুত্ব আছে। এমন একজন নেতা থাকা ভালো, যাকে দেখে মনে হয় তিনি সত্যিই এই দায়িত্বে থাকতে চান। তার আচরণ এমন নয় যে, তিনি সবাইকে ধমক দিচ্ছেন। এমনও নয় যে, তিনি শুধু একটি বিপর্যস্ত প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়েছেন। কিংবা এমন কেউ নন, যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল যে কোনোভাবে শীর্ষ পদে পৌঁছে তা আঁকড়ে ধরে থাকা।

স্টারমার বিদায় নেওয়ার আগে আমি পুরো বিষয়টি এত স্পষ্টভাবে বুঝিনি। এখন মনে হচ্ছে, তার পুরো শাসনামলে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, জনগণই কাজটি ঠিকমতো করছে না। তিনি যতটা জনপ্রিয় হওয়ার কথা ভেবেছিলেন, তা না হওয়ার দায়ও জনগণের। যেন স্থিতিশীল সরকার নিশ্চিত করা জনগণের দায়িত্ব। তাদের অস্থির হওয়া চলবে না। মতামত বদলানো চলবে না। প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে এমন অনুভূতি প্রকাশ করাও চলবে না, যা জনমত জরিপে ধরা পড়ে। অনেকেই স্টারমারের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন। তাদের ভাষায়, নিয়ন্ত্রণহীন একটি দেশের অস্থির ভোটারদের ঢেউয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়েছিলেন।

বার্নহ্যামের দৃষ্টিভঙ্গি রাজনীতির একটি মৌলিক নীতিকে আবার সামনে এনেছে। অনেক দিন ধরে এ সত্যটি হারিয়ে গিয়েছিল। মানুষকে আপন করে নিতে হয়। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি যেসব ভিডিও প্রকাশ করছেন, তা পুরোনো রাজনৈতিক ধারা থেকে আলাদা। সব ভিডিওতেই একটি নিজস্ব ভঙ্গি আছে। যেন একজন বিক্রয়কর্মী বলছেন, ‘আগে আমার কথা একটু শুনুন।’

ব্যবহারিক দক্ষতা শেখার গুরুত্ব থেকে শুরু করে খাওয়া-দাওয়া, হালকা নাশতার তালিকা পর্যন্ত নানা বিষয় নিয়ে তার পোস্ট দেখলে একটি বিষয়ই মনে হয়, ব্রিটিশ রাজনীতি এ পরিবর্তন আনতে অনেক দেরি করেছে। আগে কারও এ ধরনের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ ছিল না। সম্প্রতি কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিত্বকে কোনোভাবেই ডিজিটাল যুগের মানুষ বলা যায় না। তাদের রাজনৈতিক চরিত্র ছিল পুলিশ কর্মকর্তা, দাপটবাজ, অথবা লিজ ট্রাসের মতো। তারা এমন জনমুখী রাজনীতিক ছিলেন না। মানুষ যে প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে, তারা সেখানে গিয়ে সরাসরি কথা বলতে আগ্রহী ছিলেন না।

বার্নহ্যামের উপস্থাপনা কখনো কখনো অতিরঞ্জিত মনে হলেও আধুনিক ভিউজুয়াল মিডিয়ার যুগে ক্যামেরার সামনে তার সাবলীল উপস্থিতি একটি বড় শক্তি, যা ডানপন্থি প্রভাবশালী গণমাধ্যমের আধিপত্যপূর্ণ পরিবেশেও তাকে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দিতে পারে।

বার্নহ্যাম এসব খুব ভালো করেই বোঝেন। হয়তো প্রয়োজনের চেয়েও একটু বেশি বোঝেন। গত কয়েক বছরের হতাশাজনক রাজনীতিকে ছাপিয়ে যাওয়ার জন্য খুব বেশি কিছু করতে হয় না। একঘেয়ে টেলিভিশন ও রেডিওর ধরনকে পেছনে ফেলাও কঠিন নয়। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি ঝরঝরে ও বুদ্ধিদীপ্ত পোস্ট দিলেই অনেকের চোখে কাজ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বিষয়টি যদি সেখানেই থেমে থাকে, অর্থাৎ যোগাযোগের ধরন বদলালেও পরিবেশকে বিষাক্ত করা রাজনৈতিক অবস্থানগুলোর মোকাবিলা না করা হয়, তাহলে খুব দ্রুত এসব শুধু ব্যর্থ শব্দে পরিণত হবে। এরপর এসবও বিরক্তির কারণ হয়ে উঠবে। কেননা ডিজিটাল যুগে রাজনৈতিক সাফল্য শুধু ক্যামেরার সামনে সাবলীল হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। অনেকেই বার্নহ্যামের শৈলীর সঙ্গে এ ধারার সবচেয়ে পরিচিত মুখ জোহরান মামদানির তুলনা করেন। কিন্তু মামদানি দেখিয়েছেন, মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের দক্ষতা শুধু প্রথম ধাপ। এটি মানুষকে আপনার দিকে টেনে আনে। নির্বাচনী প্রচারের সময় বিভিন্ন ভাষায় তার ভিডিওগুলো ছিল অসাধারণ। এরপর সে যোগাযোগ ধরে রাখতে হয়। কাজের ধরন ও রাজনৈতিক চর্চায়ও যে আপনি সত্যিই নতুনত্ব আনতে চান, তা প্রমাণ করতে হয়। মানুষকে দৃঢ়ভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের প্রতিপক্ষের জন্য আপনাকে হতে হবে হাসিখুশি, আত্মবিশ্বাসী। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ভিডিওতে মামদানি বলেন, ‘মেয়র নির্বাচনে দাঁড়ানোর সময় আমি বলেছিলাম, ধনীদের ওপর কর বাড়াব।’ এরপর তিনি ক্যামেরার একেবারে কাছে এগিয়ে এসে ক্যামেরায় আলতো টোকা দেন। বলেন, ‘আজ আমরা সত্যিই ধনীদের ওপর কর বসাচ্ছি।’ নিউইয়র্কবাসীকে তিনি জানান, ‘তার প্রস্তাবিত দ্বিতীয় আবাসন কর সেসব বিলাসবহুল সম্পত্তির ওপর আরোপ করা হবে, যার নিচে দাঁড়িয়ে তিনি ভিডিওটি করছেন।

বার্নহ্যাম এরই মধ্যে কিছু বাস্তব ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি শুরু করেছেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কেন্দ্র করে। বিদ্যুৎ ও অন্যান্য বিল, বাসভাড়া এবং ভ্যাটে ছাড়ের মতো বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। একই সঙ্গে লন্ডনের হাত থেকে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের একটি শক্তিশালী বার্তাও দিয়েছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, ‘নতুন রাজনৈতিক মডেল এবং নতুন অর্থনৈতিক মডেলের।’ এ ধরনের ঘোষণা সংগ্রামের আহ্বান হওয়ার কথা। কিন্তু তার বয়ানে এখনো স্পষ্ট নয়, কোন শক্তি সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে আর কোন শক্তি তাদের শোষণ করে। এই মুহূর্তে সমস্যাগুলোর নাম উচ্চারণ করাটাই অনেক বড় পরিবর্তন। সেগুলোর সমাধানে কাজ করা আরও বড় বিষয়। তবু শুধু এটুকু যথেষ্ট হবে না।

বার্নহ্যামকে দেখে মনে হয়, তিনি সেই বড় লড়াইয়ে না গিয়েই কত দূর এগোনো যায় যেন সে হিসাবই করছেন। তিনি থ্যাচারবাদ ও নবউদারবাদের ক্ষতির কথা বলেন। কিন্তু সেগুলোকে সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ জানান না। তিনি কম কর দেওয়া ধনীদের লক্ষ্যবস্তু করতে চান না। কারণ তার ভাষায়, তিনি ‘নতুন বিভাজন তৈরি করতে চান না। মানুষকে একে অন্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চান না।’ তিনি আগের সরকারের কঠোর অভিবাসন নীতিও বহাল রাখতে প্রস্তুত। অথচ একই সময় তার বাবার সেবাযত্নে নিয়োজিত বিদেশি কর্মীদের প্রশংসাও করেন।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত খুব একটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। সবকিছু আগের মতোই চলছে। এতে বোঝা যায়, বিশ্ব যখন একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নতুনভাবে সাজানোর ব্যাপারে তার তেমন আগ্রহ নেই।

গাজা নিয়ে লেবার পার্টির অবস্থানের জন্য তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু একই সঙ্গে ইরানে বিমান হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্তরাজ্যের কিছু সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করার অনুমতিও বহাল রেখেছেন। ট্রাম্পের বক্তব্য যদি ঠিক হয়, তাহলে ‘উত্তর সাগরের তেল, বাণিজ্য, সামরিক জোট এবং হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণ’ নিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনাতেও তিনি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিপর্যয়কর কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো মৌলিক পুনর্বিবেচনার লক্ষণও এখনো দেখা যাচ্ছে না।

প্রথমে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাতে হয়। তারপর রাজনৈতিক মডেল বদলানো সম্ভব হয়। সে সংস্কৃতি শুধু উপস্থাপনা, ভাষা বা কিছু নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে হলে মানুষকে দেখাতে হবে যে, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সীমারেখাগুলো নতুন করে আঁকা হচ্ছে।

স্বল্পস্থায়ী প্রধানমন্ত্রীর এই যুগ যদি আমাদের কোনো শিক্ষা দিয়ে থাকে, তা হলো, বাহ্যিক সব সুবিধাই একসময় মিলিয়ে যায়। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা, জনমত জরিপে বিশাল ব্যবধান কিংবা ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের শক্তিশালী জনসমর্থন সবই ভেঙে পড়ে, যখন মানুষের চোখে ভীরুতা থেকে জন্ম নেওয়া অসততা ধরা পড়ে। কারণ সত্যিকারের আন্তরিকতা আসে কথার সঙ্গে কাজের মিল থেকে। তিনি হয়তো কিছুদিন তার উপস্থাপনা এবং আংশিক নীতিগত পরিবর্তনের জোরে এগিয়ে যেতে পারবেন। বার্নহ্যাম নিজেকে যে বিপ্লবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরছেন, মানুষ তখনই তাকে বিপ্লবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিশ্বাস করবে, যখন তিনি ক্যামেরার অদৃশ্য দেয়াল ভাঙবেন এবং বাস্তব রাজনীতির প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর পরিবর্তন ঘটাবেন।

লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের কলামিস্ট। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ