অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনে কড়াকড়ি, শিক্ষার্থীদের পরিবারে বিধিনিষেধ, উদ্বেগে বাংলাদেশিরাও

অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনে কড়াকড়ি, শিক্ষার্থীদের পরিবারে বিধিনিষেধ, উদ্বেগে বাংলাদেশিরাও

অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর অবস্থানের নতুন ধাক্কা এবার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবারে। স্টুডেন্ট ভিসায় দেশটিতে পড়তে আসা অধিকাংশ বিদেশি শিক্ষার্থী আর সেই ভিসার আওতায় পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসার সুযোগ পাবেন না। পাশাপাশি এক কোর্স শেষ না করেই অন্য কোর্সে ভর্তি হয়ে ভিসার ধরন বদলের প্রবণতা—‘ভিসা হপিং’—বন্ধ করতেও চালু হচ্ছে নতুন বিধান।
বৃহস্পতিবার ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে দেয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বলেন, নিট অভিবাসন কমানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভিসা ব্যবস্থায় এসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে। তবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের নাগরিক এবং পিএইচডিসহ কিছু উচ্চশিক্ষা কর্মসূচির শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যতিক্রম থাকবে। ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা যেসব শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যরা তাদের ভিসার সঙ্গে যুক্ত, নতুন সিদ্ধান্তে তাদের পরিবার বিচ্ছিন্ন হবে না।
নতুন নিয়মে কোনো শিক্ষার্থী বর্তমান কোর্স শেষ না করে অন্য কর্মসূচিতে যেতে চাইলে আগের ভিসার ওপর নির্ভর করে অবস্থান করা যাবে না। তাকে নতুন ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। সরকারের ভাষ্য, শিক্ষা ভিসাকে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের পথ হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা ঠেকাতেই এ ব্যবস্থা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, সংস্কারটি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক চাপের ফল নয়। ভিসা ব্যবস্থা পরিবর্তনের কাজ সরকার বেশ কিছুদিন ধরেই করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

সরকারের ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় খাতে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সুযোগ সীমিত হলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে দেশটির আকর্ষণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইউনিভার্সিটিস অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী লুক শিহি গণমাধ্যমকে বলেন, বিশ্বের মেধাবী শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার প্রতিযোগিতায় অস্ট্রেলিয়াকে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হবে। বিদেশি শিক্ষার্থীরা শুধু পড়াশোনায় অংশ নেন না, তাদের মাধ্যমে দক্ষতা, বিনিয়োগ ও নতুন ধারণারও প্রবাহ ঘটে।
গ্রুপ অব এইট ইউনিভার্সিটিজের প্রধান নির্বাহী ভিকি থমসন গণমাধ্যমকে বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কঠোর অবস্থান নেয়ার এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলে মনে করেন রিজিওনাল ইউনিভার্সিটিস নেটওয়ার্কের চেয়ার ও ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইংল্যান্ডের ভাইস-চ্যান্সেলর ক্রিস মোরান। তার মতে, বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমলে স্থানীয় জনপদে অর্থপ্রবাহ ও বিভিন্ন সেবায় তার প্রভাব পড়বে। ধাক্কা লাগতে পারে আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও।
অধ্যাপক মোরান বলেন, ভিসা বরাদ্দ ও অনুমোদনে কড়াকড়ির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এরই মধ্যে আর্থিক চাপের মুখে।

বাবা-মাকে আনার স্বপ্নে শঙ্কা
সিডনিতে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী রায়হানের কাছে বিষয়টি শুধু নীতিগত পরিবর্তন নয়, ব্যক্তিগত উদ্বেগেরও কারণ। বাবা-মাকে তিন মাসের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় আনার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। নতুন বিধি নিষেধের খবরে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
রায়হানের ইচ্ছা ছিল, বাবা-মা অস্ট্রেলিয়ায় এসে তার পড়াশোনাও জীবনযাপন নিজের চোখে দেখবেন। সেই পারিবারিক আনন্দের পরিকল্পনাই এখন ভিসা-অনিশ্চয়তায় আটকে গেছে। রায়হানের মতো আরও কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। 
ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস রিপ্রেজেন্টেটিভ কাউন্সিল অব অস্ট্রেলিয়ার সভাপতি ওয়েহং লিয়াং গণমাধ্যমকে বলেন, আবাসন ও অবকাঠামোর ওপর চাপের জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের একক ভাবে দায়ী করা উচিত নয়। নীতিনির্ধারণে তাঁদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কল্যাণের পাশাপাশি সামাজিক সংহতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তার মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা কেবল অভিবাসন পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যা নন। অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকালে তাঁরা সম্পর্ক তৈরি করেন, স্থানীয় সমাজের সঙ্গে যুক্ত হন এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অংশ হয়ে ওঠেন।

কমবে নিট অভিবাসন, অগ্রাধিকার দক্ষদের
বৃহত্তর অভিবাসন সংস্কারের আওতায় ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দেশটিতে অবস্থানকারীদের শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। অসাধু অভিবাসন এজেন্টদের বিরুদ্ধেও অভিযান বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের হিসাবে, চলতি অর্থবছরে নিট অভিবাসন প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজারে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরেরমধ্যে তা আরও কমে ২ লাখ ২৫ হাজারে নামতে পারে।
তবে নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। আবাসন সংকট মোকাবিলা এবং জরুরি সেবা সচল রাখতেও এসব কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় ‘গণ-অভিবাসন’ চলছে—এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক। তার মতে, অভিবাসন ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
৫০০ কর্মকর্তা, ১,২৫০ আটক শয্যা
নতুন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভিসা-সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে আরও ৫০০ কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা নিয়োগের কথা জানিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে তৈরি করা হবে ১ হাজার ২৫০টি অতিরিক্ত আটক শয্যা।
ভিক্টোরিয়ার সাবেক কোভিড কোয়ারেন্টিন কেন্দ্রগুলোকে আটককেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। পাশাপাশি অভিবাসীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কার্যক্রমে অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

এসব পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছে আশ্রয়প্রার্থী অধিকার সংগঠন অ্যাসাইলাম সিকার রিসোর্স সেন্টার। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কন কারাপানাগিওটিডিস পরিবর্তনগুলোকে ‘বহু-সাংস্কৃতিক অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি কালো দিন’ বলে মন্তব্য করেছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেন, সরকার অভিবাসী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। এসব মানুষ অস্ট্রেলিয়ায় জীবন গড়ে তুলেছেন এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রেখেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থানকারীদের ক্ষেত্রে আটককেন্দ্রের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন কারাপানাগিওটিডিস। তার অভিযোগ, নতুন পদক্ষেপে অভিবাসন আটক ব্যবস্থা আরও বড় হবে এবং অস্ট্রেলিয়া আরও ‘সংকীর্ণমনা, কঠোর ও বিভক্ত’ হয়ে উঠবে।

ট্রাম্পের সঙ্গে তুলনা
নতুন নীতি নিয়ে সমালোচকেরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলের অভিবাসন এনফোর্সমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিশেষ করে অভিবাসীদের শনাক্ত করতে বাড়তি জনবল, আটককেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ফেরত পাঠানোর জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অস্ট্রেলিয়ানদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, তার সরকারের পরিকল্পনা ট্রাম্প আমলের অভিবাসন বিরোধী ধরপাকড় অভিযানের মতো হবে না।

অন্যদিকে কারাপানাগিওটিডিস বলেছেন, অভিবাসী ওশরণার্থীদের রাজনৈতিক স্বার্থে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানানো হলে তার সংগঠন নীরব থাকবে না। মানুষের কাজের অধিকার কেড়ে নেয়া কিংবা সুরক্ষার আবেদন থেকে তাদের বঞ্চিত করার যেকোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।

সরকারের নতুন ভিসা নীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর অভিবাসন পরিকল্পনা—দুই ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবার এখন আলোচনার কেন্দ্রে। একদিকে অভিবাসন কমানোর উদ্যোগ, অন্যদিকে অর্থনীতি ও জরুরি সেবার জন্য দক্ষ জনবল ধরে রাখার প্রয়োজন—এই দুইয়ের ভারসাম্য কীভাবে করা হবে, সেটিই এখন অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ও উচ্চশিক্ষা নীতির বড় প্রশ্ন।