সিলেটে ঈদের ছুটিতে প্রাণ ফিরছে পর্যটনে
রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অতঃপর দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনায় মন্দাভাব ছিল সিলেটের পর্যটনে। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রভাব অর্থনীতিতে। সব মিলিয়ে ভাল নেই সিলেটের পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
বিশেষ করে হোটেল-মোটেল অনেকটাই ফাঁকা পড়েছিল।
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ছুটিতে মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা সিলেটের পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের।
পবিত্র ঈদুল ফিতর কেবল ধর্মীয় উৎসব-ই নয়, ঈদের ছুটিতে ভ্রমণপিপাসুরা বেড়ানোর জন্য পর্যটন নগরী সিলেটকে বেছে নেন। কেননা, জল, ঝর্ণা, পাহাড়, নদী, চা-বাগান আর সবুজের সমারোহ।
শীতল পাটি মোড়ানো সিলেট যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত ক্যানভাস। সব যেন এক স্থানে পরখ করতে পারেন ভ্রমণপিপাসুরা। যে কারণে ঘুরে বেড়ানোর তালিকায় সিলেটকেও প্রথমে প্রাধান্য দেন পর্যটকরা। পাশাপাশি সিলেটে পর্যটকরা হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) এর মাজার জিয়ারত করে যান।
পর্যটনকেন্দ্রগুলো সাধারণত ঈদের পর দিন থেকে মুখর হয়ে ওঠে বলে জানিয়েছেন জাফলং, বিছানাকান্দি, লালাখালসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকার ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ট্যুর অপারেটররা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে অধিকাংশ হোটেল ও রিসোর্টে বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে এবার শতকোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনাও দেখছেন তারা। ইতোমধ্যে সিলেটের প্রায় ৮৫ শতাংশ আবাসিক হোটেল বুকিং হয়ে গেছে।
পর্যটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, সিলেটের জাফলং, সাদা পাথর, বিছনাকান্দি, রাতারগুল ও পান্তুমাইসহ বিভিন্ন স্পট ঈদে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠবে।
সম্প্রতি বৃষ্টির কারণে এসব স্থানে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আরও বেড়েছে, যা পর্যটকদের টানবে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ঈদের ছুটিতে সিলেট বিভাগে অন্তত ১০ লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটতে পারে। এতে শতকোটি টাকার ব্যবসা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে।
সিলেটে এসে কি দেখবেন:
প্রকৃতি কন্যা জাফলং: সিলেটের পর্যটনের নাম শুনলেই যে জায়গাটির কথা সবার আগে মনে পড়ে, তা হলো জাফলং। ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা এই এলাকায় রয়েছে পাহাড়ের পাদদেশে বয়ে যাওয়া পিয়াইন নদী। নদীর বুকে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য পাথর আর স্বচ্ছ পানির ধারা মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। দূরে দেখা যায় পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ছোট ছোট ঝরনা। জাফলংয়ের সৌন্দর্য অবলোকনের এখনই মোক্ষম সময়। এলাকায় মানুষের ভিড় বাড়লেও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগে কোনো কমতি থাকে না।
নীল জলের লালাখাল:
নীল জলরাশির লালাখাল সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় অবস্থিত। লালাখালের নীলাভ জলরাশি দেখে মন জোড়ায় পর্যটকদের। পাহাড়ি উৎস থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ পানি আর নদীর দুই তীরের সবুজ গাছপালা একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে মনোরম পরিবেশ। নৌকায় চড়ে নদীর বুক দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় দূরের পাহাড়ি দৃশ্য ভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।
স্বচ্ছ জলরাশির বিছানাকান্দি:
গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছানাকান্দি সিলেটের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। ভারতের পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ জলরাশি পাথরের ওপর দিয়ে ঝরনাধারার সৃষ্টি করেছে। চারদিকে সবুজ পাহাড় যেন মাথা নুইয়ে রয়েছে। মাঝখানে স্বচ্ছ পানির ধারা, যেন প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে সাজিয়ে রেখেছে। সেথায় গা এলিয়ে স্বর্গের সুখ নেন পর্যটকরা। ঈদে ঘুরতে আসা মানুষের কাছে এটি একটি বিশেষ আকর্ষণীয় স্থান। আর বিছানাকান্দির অদূরেই পান্থুমাই ঝরনা দেখতে ছুটে যান পর্যটকরা।
স্বচ্ছ জলধারার সাদাপাথর:
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার আলোচিত স্থান সাদাপাথর। যে পাথর চুরির পর হুলস্থূল শুরু হয় দেশজুড়ে। পর্যটন কেন্দ্র বিনাশের জন্য দায়ীদের শাস্তিও পেতে হয়। এই সাদাপাথর এলাকাও পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। স্বচ্ছ পানির নিচে ছড়িয়ে থাকা সাদা পাথর দূর থেকেই ঝলমল করে। পাহাড়ি ঢল নামলে নদীর পানি আরও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে, যা দর্শনার্থীদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে। পর্যটকরা স্বচ্ছ জলে গা ভাসিয়ে দেন আপন খেয়ালে।
সবুজ পাতার শীতল পাটি চা-বাগান:
সিলেটের সৌন্দর্যের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ চা-বাগান। মালনীছড়া, লাক্কাতুড়া, খাদিমনগর, তারাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা এসব বাগান শুধু অর্থনীতির অংশ নয় বরং পর্যটনেরও অন্যতম আকর্ষণ। উঁচু-নিচু টিলা জুড়ে সবুজ চা-গাছের সারি, কুয়াশাভেজা সকাল কিংবা সোনালি বিকেল সব মিলিয়ে এখানে তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ। অনেকেই এসব বাগানে হেঁটে বেড়ান, ছবি তোলেন এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে মেলাতে চেষ্টা করেন।
সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুল:
জেলার গোয়াইনঘাটে অবস্থিত রাতারগুল দেশের একমাত্র মিঠা পানির জলার বন। বর্ষা মৌসুমে কিংবা বর্ষা শেষে যখন বনের ভেতর পানি জমে থাকে, তখন নৌকায় করে এই বন ঘুরে দেখা যায়। পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ, পাখির ডাক আর নিস্তব্ধ পরিবেশ এক রহস্যময় আবহ তৈরি করে। ঈদের ছুটিতে যারা ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, তাদের জন্য এটি হতে পারে চমৎকার একটি গন্তব্য।
অরণ্যের শান্ত ছায়া “খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান”:
নগরের উপকণ্ঠে অবস্থিত খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য এক আদর্শ স্থান। ঘন সবুজ বন, উঁচু-নিচু টিলা আর সরু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে এখানে পাওয়া যায় প্রকৃতির নিবিড় স্পর্শ। পাখির ডাক, বাতাসের শব্দ আর অরণ্যের নীরবতা মানুষকে এক ভিন্ন জগতে নিয়ে যায়। যারা কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে কিছুটা নিরিবিলি সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য এই উদ্যানটি উপযুক্ত।
আধ্যাত্মিক পর্যটন:
সিলেট ভ্রমণে ধর্মীয় স্থানগুলোর গুরুত্বও রয়েছে। নগরের অভন্তরে হযরত শাহজালাল (র.) ও শহরতলীর হযরত শাহপরাণ (র.)-এর মাজার মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের সময় এসব স্থানে ভক্তদের ভিড় বাড়ে। অনেকেই নামাজ শেষে এখানে এসে জিয়ারত করেন এবং কিছু সময় প্রার্থনায় কাটান।
এছাড়াও সিলেটের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য পর্যটন স্পট। জৈন্তিয়া রাজবাড়ি, ডিবির হাওর শাপলা বিল, তামাবিল স্থলবন্দর, জৈন্তাপুর শ্রীপুর পর্যটন কেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী ক্বীন ব্রিজ, আলী আমজদের ঘড়ি, গৌড় গোবিন্দ টিলা, হারুং-হুরুং গুহা, মনিপুরী রাজবাড়ি, মিউজিয়াম অব রাজার্স ছাড়াও অগণিত পর্যটন ও ইতিহাস ঐতিহ্য ঘুরে দেখতে সিলেটই যেন মৌসুমে পর্যটকের আকর্ষণীয় স্থান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে সিলেটের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। বিশেষ করে সাদা পাথর এলাকায় নজিরবিহীন পাথর লুটের ঘটনায় পর্যটন খাত বড় ধরনের সংকটে পড়ে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে লুট হওয়া পাথর পুনঃস্থাপনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

