ভোটে শঙ্কা বাড়াচ্ছে অনভিজ্ঞ মাঠপ্রশাসন!
ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে ভোটের সময়। এই সময়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকারের মাঠপ্রশাসনে অনভিজ্ঞতার ছাপ। প্রার্থীদের বৈধতা প্রদান, আচরণবিধি লঙ্ঘনে ব্যবস্থা গ্রহণে অদক্ষতাসহ নানা অভিযোগ আসছে তাদের বিরুদ্ধে। কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারার ঘটনা ঘটছে রাজনৈতিক সহিংসতা দমনেও। আবার প্রার্থী-প্রতিপক্ষের গ্রুপের মধ্যে সৃষ্ট অরাজকতা দমনেও ব্যর্থতার ছাপ চোখে পড়ছে। এর বাইরেও স্থানীয় ইস্যু সমাধানে অদক্ষতা দৃশ্যমান।
সম্প্রতি কারা ফটকে স্ত্রী-সন্তানের লাশ দেখা এবং প্যারোলে মুক্তি না পাওয়া এক কারাবান্দিকে নিয়ে আলোচনা দেশজুড়ে। বাগেরহাটের ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম ছিলেন যশোর কারাগারে। সোমবার হাইকোর্ট তাকে জামিন দেয়। এর আগে গত শুক্রবার তার স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পর প্যারোলে মুক্তি দেওয়া নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বাগেরহাটের পরিবর্তে যশোর জেলা প্রশাসককে আবেদন না করা, বন্ধের দিন থাকার অজুহাত এবং আবেদনের চিঠি না পাওয়াসংক্রান্ত জেলা প্রশাসনের ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হওয়াকে প্রশাসনের অদক্ষতা ও অনভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এটি এক ধরনের অপেশাদার আচরণ। মাঠপ্রশাসনের অনভিজ্ঞতা ও অদক্ষতার ফসলও বটে। যুক্তি হিসেবে তারা বলেন, কার কাছে কীভাবে আবেদন করতে হবে এবং প্যারোলের নীতিমালা কী তা সবাই না-ও জানতে পারেন। প্রশাসনের ব্যক্তিরা স্বতঃস্ফূর্ত সাহায্য করলে বিষয়টি এতদূর গড়াত না। ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে তাৎক্ষণিক কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া ছিল বাঞ্ছনীয়।
নির্বাচন সামনে রেখে জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পরিবর্তন আনে সরকার। তারা নির্বাচনকালে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন। আর সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাও (ইউএনও) নতুন। ডিসিদের বেশির ভাগ ২৭ ব্যাচের আর ইউএনও হিসেবে দায়িত্বরতদের বেশির ভাগ ৩৭ ব্যাচের। কিছু আছেন ৩৬ ব্যাচের কর্মকর্তা। মাঠপ্রশাসনের কাজের অনভিজ্ঞতার কারণে নির্বাচনের আগমুহূর্তে তাদের কাজে অদক্ষতা ফুটে উঠছে। যদিও এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদ মনে করেন, কাজ করতে করতে অভিজ্ঞতা হয়। অভিজ্ঞ হয়ে কেউ আসে না। মাঠপ্রশাসনের কাজ তদারকি করা হচ্ছে।
জানা গেছে, গত ২০ জানুয়ারি দেশের ৮ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বদলি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বদলি প্রজ্ঞাপনের পরের দিনই গত বুধবার বদলি আদেশে অবমুক্তির তারিখ বা তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্তির আদেশ অংশটুকু বাতিল করা হয়। এর পরের দিন গত বৃহস্পতিবার সকালে বদলির আদেশটিই বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ত্রায়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ২২ দিন আগে এমন বদলির নেপথ্য কী ঘটনা থাকতে পারে এমন প্রশ্ন ওঠে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কর্মকর্তারা মাঠপ্রশাসনে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। দলীয় নেতাকর্মীরা চাপ দিলে কিংবা অসদাচরণ করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারছে না মাঠপ্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা। নির্বাচনের প্রার্থী বা তাদের অনুসারীরা কর্মকর্তাদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শান্তভাবে শক্ত পদক্ষেপ নিতে পারছেন না কেউ কেউ। অনেকের আচরণে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রার্থিতা ঘোষণা, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় শতভাগ পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে পারছে না কর্মকর্তারা।
নেত্রকোনার কলমাকান্দা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, ফরিদপুরের নগরকান্দা, বগুড়ার ধুনটসহ বেশ ক’টি উপজেলার ঘটনা সম্প্রতি নজরে এসেছে। তবে মাঠপ্রশাসনকে সহযোগিতার বদলে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আছে প্রশাসনের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধেও। তিন মাস আগে বগুড়ার ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন হওয়া প্রীতিলতা বর্মণকে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় বদলি করা হয়। বদলির আগের দিন তিনি ধুনট হাসপাতালের সরকারি জমি দখল করে দোকান নির্মাণের খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। এতে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি পক্ষ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে বদলির বন্দোবস্ত করেন।
ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) সংসদীয় আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী ও দলটির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর লোকজনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। রোববার সন্ধ্যা থেকে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি এ হামলা চলে। এতে বিএনপির দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর, স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। গতকাল রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই আসনের এ দুই প্রার্থীর কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন এমনটি জানা সম্ভব হয়নি। এ ধরনের ঘটনায় আইনানুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নির্বাচনের আগে এ ধরনের সহিংসতা এড়াতে মাঠপ্রশাসন শক্ত থাকা জরুরি বলে মনে করছেন প্রশাসনের র্ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
শুধু নির্বাচনের মাঠ নয়, সাধারণ কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও স্থানীয়ভাবে মাঠপ্রশাসনে অযোগ্যতা সামনে আসছে। ‘আপু’ বলায় লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শামিমা আক্তার জাহান ক্ষেপে যান। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঠপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের এমন অপেশাদার আচরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বিব্রত প্রশাসন। গত বছরের ১০ জুলাই সরকারি নারী কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ সম্বোধনের নির্দেশনা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় সরকারি কর্মকর্তাদের তাকে ‘স্যার’ সম্বোধন করতে বলে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়।
এই চর্চা উঁচু পদের অন্য নারী কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়। তাদের ‘স্যার’ বলা হয়, যা স্পষ্টত অস্বাভাবিক। প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনেকে শৃঙ্খলা বা আচরণবিধি মানছেন না। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা মানা নিয়েও অনেকের অনিচ্ছা দেখা যাচ্ছে। ফলে কখনও কখনও তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসংযত আচরণ করছেন। ক্ষমতার অন্যায্য ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। কোনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দাম্ভিকতা ও বেপরোয়া আচরণের অভিযোগ বেড়ে গেছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে তা চোখে পড়ছে বেশি।
এদিকে এবারের জাতীয় নির্বাচনের আগে ডিসি পদে এসপি পদের চেয়ে জুনিয়র ব্যাচের কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ায় আরেক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ডিসি। মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বেশির ভাগ জেলার এসপি যোগ দেন না।
নির্বাচনের আগে এ দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মাঠপ্রশাসনে ৬৪ জেলার মধ্যে অন্তত ৩০ জেলায় নিয়োগপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) পুলিশ সুপারদের (এসপি) চেয়ে জুনিয়র ব্যাচের। অথচ দীর্ঘদিনের রেওয়াজ অনুযায়ী এবং জেলা প্রশাসনের নেতৃত্ব বজায় রাখার প্রশ্নে এসপিদের চেয়ে ডিসিরা ছিলেন সিনিয়র ব্যাচের। কিন্তু এই প্রথম ডিসি নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়টিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এ ধরনের নিয়োগ বিবেচনাপ্রসূত কাজ নয় এবং এতে প্রশাসনিক ভারসাম্য বিনষ্ট করছে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।

