সিলেটের ১৯ আসনে বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে প্রবাসী বনাম স্থানীয়দের লড়াই

সিলেটের ১৯ আসনে বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে প্রবাসী বনাম স্থানীয়দের লড়াই

সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকা প্রায় অর্ধেকে নেমে এলেও প্রার্থী চূড়ান্তকরণে দেখা দিয়েছে জটিলতা। দলের একাধিক সূত্র বলছে, বিশেষ করে যেসব আসনে হেভিওয়েট নেতারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন, সেসব জায়গায় প্রবাসী নেতাদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে কয়েকটি আসনে স্থানীয় হেভিওয়েট নেতারা প্রবাসী প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে ধরাশায়ী হওয়ার আশঙ্কা করছেন।

বর্তমানে সিলেট বিভাগের চার জেলায় বিএনপির ১৯টি আসনে মোট ১৩৬ জন মনোনয়নপ্রত্যাশীর মধ্যে ৬৬ জনকে প্রাথমিকভাবে মাঠে রেখেছে কেন্দ্র। খুব শিগগিরই এ তালিকা আরও সংক্ষিপ্ত করে ১৯ জনের চূড়ান্ত নাম ঘোষণা করবে দলীয় কেন্দ্র।

সিলেট-১: হেভিওয়েটদের লড়াই

সবচেয়ে আলোচিত আসন সিলেট-১। এখানে দুইজনই চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা— সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এবং তিনবারের সাবেক এমপি খন্দকার আব্দুল মালিকের ছেলে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মুক্তাদিরের পক্ষে লন্ডনভিত্তিক প্রভাবশালী বিএনপি নেতা পাশা খন্দকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বড় ভূমিকা রাখছে।

সিলেট-২: ইলিয়াস আলীর আসন

‘ইলিয়াস আলীর আসন’ হিসেবে পরিচিত সিলেট-২ এ মনোনয়নপ্রত্যাশী দুইজন— নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তাহসিনা রুশদী লুনা, এবং সম্প্রতি যুগ্ম মহাসচিব পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত, যুক্তরাজ্য বিএনপির শীর্ষনেতা হুমায়ুন কবির। এ আসনে লড়াই মূলত দেশীয় ও প্রবাসী দুই শক্তির মধ্যে।

সিলেট-৩: তিন প্রভাবশালীর সংঘর্ষ

এ আসনে রয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এমএ মালেক, এবং ব্যারিস্টার এমএ সালাম। পাশাপাশি সাবেক ছাত্রনেতা আহাদ খান জামাল, ব্যারিস্টার রিয়াসাদ আজিম আদনান, ও ড. ফয়েজ উদ্দিনও মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে মাঠে রয়েছেন।

সিলেট-৪: প্রবাসী প্রার্থীদের দৌড়

এ আসনে প্রবাসী প্রার্থীর সংখ্যাই বেশি। আলোচনায় আছেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হাকিম চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, এবং ব্যারিস্টার কামরুজ্জামান সেলিম।
প্রবাসফেরত নেতা অ্যাডভোকেট শামসুজ্জামান জামান সম্প্রতি বড় জনসভা ও মোটরসাইকেল শোডাউন করে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন।

সিলেট-৫: হারিছ চৌধুরীর পরিবারের প্রভাব

এ আসনে সাবেক ছাত্রনেতা মামুনুর রশীদ মামুনের পাশাপাশি প্রয়াত নেতা হারিছ চৌধুরীর পরিবারের প্রভাব এখনো ব্যাপক। তার মেয়ে সামিরা তানজীন চৌধুরী নির্বাচনে না এলেও চাচাতো ভাই আশিক চৌধুরী, প্রবাসী নেতা জাকির হোসেন, ও সাবেক ছাত্রনেতা সিদ্দিকুর রহমান পাপলুও মনোনয়ন প্রত্যাশী।
জোট গঠিত হলে এ আসন জমিয়তকে ছেড়ে দেওয়ার আলোচনা চলছে, যেখানে প্রার্থী হতে পারেন মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক।

সিলেট-৬: একাধিক কেন্দ্রীয় মুখ

এই আসনে কেন্দ্রীয় নেতা আবুল কাহের শামীম, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এনামুল হক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমেদ চৌধুরী, প্রবাসী নেতা সাবিনা খান পপি, এবং চিত্রনায়ক হেলাল খানসহ অন্তত সাতজন মনোনয়নপ্রত্যাশী আছেন।

হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জেও জমে উঠেছে দৌড়

হবিগঞ্জে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক মেয়র জিকে গউস শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে মাঠে কাজ করছেন, তবে স্থানীয় প্রতিপক্ষরাও সক্রিয়।

সুনামগঞ্জ-৫ এ সহসাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন মিলন ও কেন্দ্রীয় নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী মনোনয়ন যুদ্ধে।

মৌলভীবাজারে পারিবারিক রাজনীতি ও নতুন মুখ

এ জেলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ছেলে এম নাসের রহমান অন্যতম প্রার্থী। পাশাপাশি মুজিবুর রহমান, সুনামগঞ্জের নাসির উদ্দিন চৌধুরী, এবং কেন্দ্রীয় সহসমবায় সম্পাদক শাম্মী আক্তারও মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে সক্রিয়।

কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে সিলেটবাসী

বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, “গোটা সিলেটবাসী এখন কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে। প্রার্থী চূড়ান্ত হলে ধানের শীষের পক্ষে মাঠে নামবেন সব মনোনয়ন প্রত্যাশী—এটা অনেকটা নিশ্চিত।”

সংক্ষিপ্তসার:
সিলেটের ১৯টি আসনে বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে প্রবাসী বনাম স্থানীয় হেভিওয়েট নেতাদের দ্বন্দ্ব নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। দলীয় কেন্দ্র এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে—কার হাতে যাবে ধানের শীষ, সেটিই দেখার বিষয়।