ছয় মাসে ১৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১১৭ জন নিহত
সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক যেন মরণফাঁদ
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় বিকট এক শব্দ, আর তারপরেই চারদিকে শুধু আর্তনাদ। সকালের সোনালী রোদ ওঠার আগেই নিভে গেছে ৯টি পরিবারের প্রদীপের আলো। বেপরোয়া গতি আর একটু সামনে চলে যাওয়ার মরণপণ প্রতিযোগিতায় ফের রক্তে ভিজল পিচঢালা পথ। গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই থেমে গেল কতগুলো স্বপ্ন। কিন্তু প্রশ্ন একট আর কত মায়ের কোল খালি হলে, আর কত তাজা প্রাণ ঝরে গেলে টনক নড়বে সংশ্লিষ্টদের? মহাসড়ক কি তবে এখন একেকটি মৃত্যুফাঁদ?
শুক্রবার ভোরে ঘটে যাওয়া দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বাউল শিল্পী পেহেলী ভৈরবী (ইসরাত জাহান) এবং ৩ বছর বয়সী শিশু ফাইজাসহ মোট ৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্বনাথে একটি মাজারের অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে এই তরুণী শিল্পী পথেই প্রাণ হারান এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় শিশুটি।
এমন ভয়ঙ্কর ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক নাকি রক্তক্ষয়ী ফাঁদ? হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ সিলেট অঞ্চলের আওতাধীন মহাসড়কে গত ছয় মাসে ১৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৭৫ জন। এর মধ্যে গুরুতর আহত হয়েছেন ১০৯ জন।
হাইওয়ে পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে ২২টি দুর্ঘটনায় ১৪ জন, মার্চে ৪১টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন, এপ্রিলে ২৩টি দুর্ঘটনায় ১৪ জন, মে মাসে ৪০টি দুর্ঘটনায় ২২ জন, জুনে ৩২টি দুর্ঘটনায় ২৯ জন এবং জুলাইয়ে ৩২টি দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে সাধারণ আহত হয়েছেন ১৬৬ জন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকের বেপরোয়া গতির পাশাপাশি যত্রতত্র পার্কিং, মহাসড়কের পাশে ভাসমান দোকান এবং হাটবাজারকেন্দ্রিক যানজট দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। মৌলভীবাজারের শেরপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বর, নবীগঞ্জের আউশকান্দি কিবরিয়া চত্বর, শায়েস্তাগঞ্জ পয়েন্ট এবং সিলেটের ওসমানীনগরের গোয়ালাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের সমস্যা রয়েছে।
এছাড়া ছয় লেনের কাজের ধীরগতি, ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং চালকদের মরণপণ ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতাই এই পথকে কসাইখানায় পরিণত করেছে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা তাদের নাকের ডগা দিয়েই দিন-রাত চলছে গতির এই উন্মাদনা। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন-আর কত প্রাণ গেলে ভাঙবে কর্তৃপক্ষের গভীর ঘুম?
পুলিশ জানায়, বেপরোয়া গতির কারণেই এই মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। মানুষজন বলছেন, আর কত এমন তাজা প্রাণ ঝরলে নিরাপদ হবে এই সড়ক? কত সুর আর শৈশব এভাবে পিচঢালা পথে পিষ্ট হলে টনক নড়বে প্রশাসনের?
ওদিকে, দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটনে বরাবরের মতো এবারো হয়েছে তদন্ত কমিটি। ৯ জন নিহতের ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটিকে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
শনিবার দুপুরে সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) পিংকি সাহাকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিতে হাইওয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) সদস্য করা হয়েছে। সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন এ তথ্য জানিয়েছেন।
শুক্রবার সকাল আনুমানিক ৭টা ১০ মিনিটে ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, এ দুর্ঘটনায় মোট ৯ জন নিহত এবং ১৬ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সাতজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে ৩ থেকে ৪ বছর বয়সী এক শিশুকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা দ্রুত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। সেখানে আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি তাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক জানান, দুর্ঘটনায় আহত প্রত্যেককে তাৎক্ষণিকভাবে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন গুরুতর একজনকে ১৫ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। এছাড়া নিহতদের দাফন-কাফনের জন্য প্রতিটি পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, দুর্ঘটনার সময় মহাসড়কটি ফাঁকা ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, চালকদের বেপরোয়া গতি অথবা গাড়ি চালানোর সময় ঘুমিয়ে পড়ার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে এটি কেবল প্রাথমিক ধারণা। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পরই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্ট বিষয় ও সম্ভাব্য দায় নিরূপণে তদন্ত কমিটি কাজ করবে। কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে, দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা, পঙ্গুত্ব বরণকারীদের ৩ লাখ টাকা এবং চিকিৎসাধীন আহতদের ১ লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীনদের দেখতে শনিবার সকালে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এসময় তিনি আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন।

