ইইউতে ফিরতে পারে যুক্তরাজ্য: বার্নাম

ইইউতে ফিরতে পারে যুক্তরাজ্য: বার্নাম

প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পুনরায় যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। ইউরোপের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিভিন্ন বিকল্পের সুবিধা-অসুবিধা পর্যালোচনার পর প্রয়োজনে ইইউর সদস্যপদে ফেরার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে বলে তার মন্তব্যে ব্রেক্সিট নিয়ে দেশটির পুরোনো বিভাজনমূলক বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে।

লন্ডন থেকে এএফপি জানায়, বার্নহাম বলেন, ইউরোপের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্ভাব্য বিভিন্ন ধরনের সম্পর্কের ‘সুবিধা ও অসুবিধা’ বিবেচনার পর তাঁর মধ্য-বামপন্থী লেবার সরকার চাইলে ইইউর সদস্যপদে ফেরার বিষয়টিও বিবেচনা করতে পারে।

তার এ মন্তব্যের তাৎক্ষণিক সমালোচনা করেছে ডানপন্থী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা। ২০১৬ সালে ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোটের পর ব্রিটিশ রাজনীতিতে যে তীব্র ‘ব্রেক্সিট যুদ্ধ’ শুরু হয়েছিল, সেই বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে।

জুলাইয়ে লেবার পার্টির এমপিরা কিয়ার স্টারমারকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর বার্নহাম প্রধানমন্ত্রী হন। এর আগে জুনে তিনি পার্লামেন্টে ফিরে আসার নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন এবং সে সময় স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পাশাপাশি ব্রেক্সিট বিতর্ক আবার ‘টেনে আনতে’ চান না বলে জানিয়েছিলেন।

বার্নহাম অবশ্য ইইউতে থাকার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। এর আগে তিনি বলেছিলেন, তার জীবদ্দশায় ব্রিটেন আবার ইইউতে ফিরে যাবে বলে তিনি আশা করেন।

জুনেই সুরভেশন পরিচালিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, আবার গণভোট হলে ৫৫ শতাংশ ভোটার ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার পক্ষে ভোট দিতে পারেন।

জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর মঙ্গলবার লেবার পার্টির বার্ষিক সম্মেলনে বার্নহাম বলেন, ২০২০ সালে ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ ‘লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করেছে’।

তিনি বলেন, ব্রেক্সিটের কারণে ‘এক দশক ধরে প্রবৃদ্ধি কমেছে’ এবং ব্রিটেনকে তার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারের সঙ্গে ‘দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে’।

ইউরোপের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ‘বিভিন্ন বিকল্প’ নিয়ে আলোচনা করার কথা জানান তিনি। এ বছরের শেষ দিকে ইইউর ২৭ সদস্যদেশের সঙ্গে পরিকল্পিত শীর্ষ সম্মেলনের আগে এসব বিকল্প তুলে ধরবেন বলেও জানান।

এর পরদিন বুধবার বিবিসি রেডিওর ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে বার্নহাম বলেন, সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে ইউরোপীয় একক বাজার ও কাস্টমস ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার বিষয়টি থাকতে পারে, ‘অথবা আমরা পুরো পথও পাড়ি দিতে পারি’।

তিনি বলেন, ‘স্পষ্টতই এমন কিছু বিকল্প রয়েছে, যেগুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনটি বাস্তবায়নযোগ্য এবং প্রতিটির সুবিধা ও অসুবিধা কী—তা আমাদের দেখতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি যা বলছি তা হলো, এই প্রশ্নটি অনির্ধারিত অবস্থায় ফেলে রাখা যথেষ্ট নয়।’

২০১৬ সালের গণভোটে ৫২ শতাংশ ব্রিটিশ ইইউ ছাড়ার পক্ষে এবং ৪৮ শতাংশ বিপক্ষে ভোট দেন। পরবর্তী সময়ে ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে যায়।

যুক্তরাজ্য-ইইউ সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডেভিড হেনিগ এএফপিকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, বার্নহাম দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত এই ধারণাটি উপলব্ধি করছেন যে ব্রেক্সিট ব্যর্থ হয়েছে এবং লেবার পার্টির মধ্যেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রয়োজন রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এখনও আমি মনে করি না যে তিনি ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্তত এ কারণে নয় যে, এটি রাজনৈতিকভাবে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে এবং আগের অস্থিরতা আবারও উসকে দিতে পারে। তবে আমার ধারণা, তিনি বুঝতে শুরু করেছেন যে বাস্তবসম্মত আর কোনো বিকল্প নাও থাকতে পারে।’

বর্তমানে বার্নহাম ২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টির দেওয়া ইশতেহারের শর্তে আবদ্ধ। ওই ইশতেহারে কাস্টমস ইউনিয়নে যোগ দেওয়া, একক বাজারে ফিরে যাওয়া কিংবা ইইউর সঙ্গে অবাধ চলাচলের সুযোগ পুনর্বহালের বিষয়টি নাকচ করা হয়েছিল।

বার্নহামের মন্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে, ২০২৯ সালে প্রত্যাশিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণার আগে তিনি এসব অবস্থান থেকে সরে আসতে পারেন।

‘বাস্তবসম্মত বিকল্প?’

যুক্তরাজ্য ইন এ চেঞ্জিং ইউরোপ থিংকট্যাংকের পরিচালক আনন্দ মেনন বার্নহামের মন্তব্যকে ইইউতে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর ইঙ্গিত হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘তিনি যা বলেছেন, তা হলো—এখন আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করব। তার মন্ত্রিসভায় এমন কয়েকজন রয়েছেন, যারা চান না যে তিনি ইউরোপ নিয়ে অনেক সময় ও প্রচেষ্টা ব্যয় করুন।’

ইইউবিরোধী রিফর্ম ইউকে দলের উপনেতা রিচার্ড টাইস অভিযোগ করেন, বার্নহাম ‘পেছনের দরজা দিয়ে আমাদের আবার ব্রাসেলসে ঢোকানোর চেষ্টা করছেন’। কনজারভেটিভ পার্টির উপনেতা অ্যালেক্স বুর্গহার্টও প্রধানমন্ত্রীকে ‘পেছনের দিকে ফিরে তাকানোর’ জন্য অভিযুক্ত করেন।

এদিকে যুক্তরাজ্য-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনটি জুলাইয়ে ব্রাসেলসে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্টারমার লেবার পার্টির নেতৃত্ব থেকে অপসারিত হয়ে বার্নহামের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর সম্মেলনটি স্থগিত করা হয়।

‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’ বুধবার জানিয়েছে, আগামী ২০ নভেম্বর সম্মেলনটি আয়োজনের জন্য প্রাথমিকভাবে তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে তারিখটি এখনও নিশ্চিত হয়নি।

ইইউর এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, নভেম্বর মাসে সম্মেলন আয়োজনের দিকে জোটটি এগোচ্ছে, তবে তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

তিনি বলেন, ‘স্পষ্টতই পরিস্থিতি ইতিবাচক এবং একটি সফল সম্মেলন আয়োজনের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এ জন্য প্রস্তুতিমূলক অনেক কাজ চলছে।’

দুই পক্ষ সম্মেলনে খাদ্য ও প্রাণীস্বাস্থ্য নিরাপত্তা মান, তরুণদের জন্য চলাচল কর্মসূচি এবং তাদের কার্বন নিঃসরণ বাণিজ্যব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ স্থাপনসহ কয়েকটি চুক্তি উপস্থাপনের আশা করছিল।

তবে নির্দিষ্ট কিছু শিল্প সুরক্ষায় ইইউর ‘মেড ইন ইউরোপ’ পরিকল্পনা নিয়ে ব্রিটেনের উদ্বেগের কারণে আলোচনা থমকে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।