ওসমানী বিমানবন্দরে পরিবর্তনের হাওয়া, আস্থা ফিরেছে যাত্রীদের
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে প্রবাসী প্রবাহের অন্যতম প্রধান টার্মিনাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরেই যাত্রী হয়রানি, অবৈধ পার্কিং, চুরি-চক্র, অতিরিক্ত ফি আদায়, ভিক্ষুকদের দৌরাত্ম্যসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত ও সমালোচনার মুখে পতিত ছিল বন্দরটি। এরপর চলতি বছরের মে মাসে বন্দরের দায়িত্ব পান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. এমদাদুল হক শরীফ।
যোগদানের পর তাঁর নেতৃত্বে ধারাবাহিক অভিযানে বদলে গেছে বিমানবন্দরের পরিস্থিতি। যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, হয়রানি প্রতিরোধ ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার এসব উদ্যোগ ইতোমধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে যাত্রীদের। বিমানবন্দর সূত্রে প্রাপ্ত তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত উল্লেখযোগ্য কিছু অভিযান ও উদ্যোগের কথা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
যাত্রী হয়রানি প্রতিরোধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচাননা
যাত্রীদের হয়রানি রোধে গত তিন মাসে বিমানবন্দরে ৭০ টিরও বেশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এ সময় যাত্রী হয়রানি, অবৈধ পার্কিং, পোস্টার-স্টিকার লাগানো, ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে হয়রানি, নিরাপত্তাকর্মীদের সাথে অসদাচরণ, এয়ারলাইন্সের সেবা ব্যত্যয়সহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়।
বিমানবন্দরের ৭ টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাত্রী অভিযোগ গ্রহণের জন্য স্ট্যান্ডবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে, যাতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ বা ই-মেইলে সহজেই অভিযোগ জানাতে পারেন যাত্রীরা। এ উদ্যোগের ফলে অভিযোগ পাওয়া ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া আরও কার্যকর হয়েছে।
লোডার চক্র নির্মূল ও যাত্রীদের স্বস্তি
দীর্ঘদিন ধরে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি লোডার চক্র লাগেজ ট্রলি নিয়ে বের হওয়া যাত্রীদের পিছু নিত এবং গাড়িতে তুলে দেওয়ার পর জোর করে অর্থ দাবি করতো। ধারাবাহিক অভিযানে অন্তত ১০ জনকে এক থেকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এই চক্র পুরোপুরি নির্মূল হওয়ায় যাত্রীরা নির্ভয়ে নিজেদের লাগেজ নিজেরাই বহন করতে পারছেন। অভিযোগও প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
ডলার-পাউন্ড চাওয়া ভিক্ষুকদের দৌরাত্ম্যের অবসান!
“এক্সকিউজ মি স্যার, আই’ম হাংরি-গিভ মি টেন পাউন্ড!” এমন দৃশ্য ওসমানী বিমানবন্দরে ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। পরে জানা যায়, অনেক ভিক্ষুকই আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, কেউ কেউ আবার ভিক্ষুকদের ইংরেজি শেখানো পর্যন্ত করত! নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের জিম্মায় হস্তান্তরসহ কঠোর নজরদারিতে বর্তমানে বিমানবন্দর এলাকা ভিক্ষুকমুক্ত।
যত্রতত্র পার্কিং নিয়ন্ত্রণে ৫০ এর অধিক গাড়ি চালককে জরিমানা
বিমানবন্দরের ক্যানোপি ও কার পার্কিং এলাকায় নো-পার্কিং জোনে গাড়ি রেখে চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো ছিল বহুদিনের সমস্যা। নিয়মিত অভিযানে গত তিন মাসে ৫০ জনের অধিক চালককে জরিমানা করা হয়েছে। এর ফলে নো পার্কিং এরিয়াতে পার্কিং না থাকায় যাত্রী চলাচল নির্বিঘ্ন হয়েছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি কমেছে এবং বিমানবন্দর এলাকায় শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে।
টয়লেটে অতিরিক্ত ফি নিলে ইজারাদারকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা
পাবলিক টয়লেটে নির্ধারিত ৫ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা আদায় করছিলেন ইজারাগ্রহীতা। অভিযোগের সত্যতা মেলায় তাকে ৩০,০০০ টাকা জরিমানা করা হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে ফি সংশোধন করে নতুন নোটিশ লাগানো হয়।
যাত্রীছাউনিতে পোস্টার উচ্ছেদে ২০ হাজার টাকা জরিমানা
যাত্রীছাউনিতে লাগানো পোস্টার ও স্টিকার টার্মিনালের সৌন্দর্য নষ্ট করছিল। অভিযানে দোষীদের শনাক্ত করে ২০ হাজার টাকা জরিমানা এবং তাৎক্ষণিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা করা হয়।
উল্লেখযোগ্য আরও পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে, বিমানের যাত্রী মনিটর ভাঙায় ১১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায়, লন্ডন-সিলেট ফ্লাইটে এক যাত্রী বিমানের মনিটর ভেঙে ফেলায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পক্ষে ১১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয় যা দেশের বিমানবন্দর ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
পাশাপাশি ফ্লাইটে কেবিন ক্রুকে উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় অভিযুক্ত এক যাত্রীকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা । যাত্রী আচরণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর উদাহরণ। আনসার ও এপিবিএন পুলিশ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দায়িত্বপালনে প্রতিবন্ধকতা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ।
ঢাকা বিমানবন্দরে আগুনের ঘটনায় সিলেটে জরুরি অবতরণ করা যাত্রীদের কাছ থেকে একটি দোকান অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা। বিমানবন্দরের একটি সেবা সংস্থার কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য বেতন পাচ্ছিলেন না, তাদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিমানবন্দরে আমূল পরিবর্তন এসেছে। অনিয়ম ও অপরাধ দমনে তাঁর জিরো টলারেন্স নীতি বেশ প্রশংসিত।

