সিলেট সীমান্তে যুবককে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ বিজিবি সদস্যদের বিরুদ্ধে

সিলেট সীমান্তে যুবককে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ বিজিবি সদস্যদের বিরুদ্ধে

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি সীমান্তের মুসলিম পাড়া এলাকায় দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবককে লাঠি দিয়ে মারধর করে আহত করার অভিযোগ উঠেছে বিজিবির দুই সদস্যের বিরুদ্ধে।

অভিযুক্তরা হলেন সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি) অধীন বিছনাকান্দি বিজিবি ক্যাম্পের সদস্য ভিআইপি রুজ্জেল ও হারুন আহমেদ।

আহত যুবকের নাম আল আমীন (২৪)। তিনি গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি ইউনিয়নের ঝারিখাল কান্দি গ্রামের মৃত সফি উল্লাহর ছেলে। ঘটনার পর স্থানীয়রা ও স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে গোয়াইনঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

শুক্রবার (২৭ আগস্ট) রাত সাড়ে ৭টার দিকে বিছনাকান্দি ইউনিয়নের বগাইয়া মুসলিম পাড়া গ্রামের রাজিবের দোকানের সামনে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ঘটনার সময় আল আমীন রাজিবের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় বিছনাকান্দি বিজিবি ক্যাম্পের সদস্য ভিআইপি রুজ্জেল ও হারুন আহমেদ সেখানে গিয়ে তাকে লাঠি দিয়ে মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে লাঠির আঘাতে আল আমীন মাটিতে পড়ে যান বলে দাবি তাদের।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও অভিযোগ করেন, স্থানীয়রা মারধরের কারণ জানতে চাইলে বিজিবি সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।

স্থানীয়দের দাবি, ঘটনাস্থল সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় ৬০০ মিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। সেখানে একটি চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবককে এভাবে মারধর করা উচিত নয়।

কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ভিআইপি রুজ্জেল বিছনাকান্দি ক্যাম্পে আসার পর থেকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণ ও মারধরের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। কয়েকদিন আগে দুই শ্রমিককে মারধর করে আহত করা এবং সীমান্ত থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে একটি বাড়ির সামনে রাস্তায় থাকা মোটরসাইকেল ভাঙচুরেরও অভিযোগ করেন তারা।

তাদের ভাষ্য, কেউ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাকে আটক করে আইনের আওতায় নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এভাবে মারধর করে আহত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

আহতের পরিবারের বক্তব্য
আহত আল আমীনের ছোট ভাই রোহুল আমিন বলেন, “মুসলিম পাড়ার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আমার ভাইকে বিজিবি সদস্যরা পিটিয়ে অজ্ঞান করে ফেলেন। পরে আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে গোয়াইনঘাট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে সে চিকিৎসাধীন।”

বিজিবির বক্তব্য
তবে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিছনাকান্দি বিজিবি ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা হারুন আহমেদ।

তিনি বলেন, বিছনাকান্দি পর্যটন স্পটের পাশে ভারতীয় জিরা বোঝাই একটি নৌকা আটক করা হয়। এ সময় চোরাকারবারিরা বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে “বেয়াদবি” করেন। পরে দুজন মোটরসাইকেলে করে ফেরার পথে তাদের গতি রোধ করে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করা হয়। এতে ঘটনাস্থলে অনেক লোক জড়ো হয়।

হারুন আহমেদের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের ধাওয়া দিলে এ সময় আল আমীন উষ্টা খেয়ে পড়ে গিয়ে হাঁটুতে আঘাত পান। পরে বিজিবি সদস্যরা সেখান থেকে চলে আসেন।

বিছনাকান্দি বিওপির ক্যাম্প কমান্ডার নায়েব সুবেদার জালাল উদ্দীন বলেন, বিছনাকান্দি পর্যটন স্পট থেকে ২৫ থেকে ৩০ বস্তা ভারতীয় জিরা আটক করা হয়েছিল। এ সময় সেখানে থাকা শ্রমিকরা হৈ-হুল্লোড় শুরু করেন এবং বিজিবির সদস্যদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধরনের আচরণ করেন। পরে শ্রমিকরা পালিয়ে গেলে নৌকায় করে জিরাগুলো ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়।

তিনি বলেন, ভিআইপি রুজ্জেল ও হারুন আহমেদ মোটরসাইকেলে করে মুসলিম পাড়া মসজিদের দিকের রাস্তা দিয়ে ক্যাম্পে ফেরার সময় দোকানের সামনে তাদের গতি রোধ করা হয়। এ সময় চোরাচালানের কাজে জড়িত শ্রমিকদের সঙ্গে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

ক্যাম্প কমান্ডার আরও দাবি করেন, আল আমীনকে কোনো ধরনের মারধর করা হয়নি। ঘটনার পর শতাধিক বহিরাগত শ্রমিক আহত ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পের সামনে মিছিল করেন। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

‘বিজিবির সদস্যদের কাউকে আঘাত না করার নির্দেশনা দেওয়া আছে’
সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক বলেন, ভারতীয় জিরা বোঝাই নৌকা আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ মব সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল।

তিনি বলেন, “আমার লোকজনকে বলা আছে, কারও গায়ে আঘাত করবে না। আইন আছে, আইনেই দেখবে।”

বিজিবি অধিনায়ক আরও বলেন, “বিজিবি একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। সুশৃঙ্খল বাহিনীর সদস্য হয়ে কেন আরেকজনকে মারধর করব? এটা আমার পক্ষ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে।”

অভিযোগটি ‘সাজানো নাটক’ দাবি করে তিনি বলেন, বিজিবির সুনাম ক্ষুণ্ন করা এবং নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য একটি পক্ষ এমন ঘটনা ঘটিয়েছে।

তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে এবং এ ঘটনায় মামলা করা হবে বলেও জানান ৪৮ বিজিবির অধিনায়ক।

ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ ও বিজিবির বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী দাবি থাকায় প্রকৃত ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।